বৃহস্পতিবার , ২৪ জুন ২০২১
  • প্রচ্ছদ » অপরাধ » সমাজের কিশোরদের মূল সমস্যার নামই হচ্ছে ‘কিশোর গ্যাং’


সমাজের কিশোরদের মূল সমস্যার নামই হচ্ছে ‘কিশোর গ্যাং’




ফটো নিউজ ২৪ : 29/05/2021


-->

কোনো অবস্থাতেই কিশোর গ্যাং কালচার রোধ করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, খুলনা, সিলেট, রংপুর, রাজশাহীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে এখন কিশোর গ্যাং কালচার চরম অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। সমাজের কিশোরদের মূল সমস্যার নামই হচ্ছে ‘কিশোর গ্যাং’।

বিপথগামী কিশোররা এলাকায় মাদক ব্যবসা, মাদক সেবন, চাঁদাবাজি এমনকি হত্যার মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। এ কিশোর গ্যাং গ্রুপগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে শতাধিক গডফাদার। পর্দার আড়ালে থেকে রাজনৈতিক পরিচয় বহন করে গডফাদাররা কিশোর গ্যাং দিয়ে এলাকায় মস্তানি, চাঁদাবাজি ও এলাকা নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে খুনোখুনির ঘটনাও ঘটাচ্ছে। একেকটি ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নড়েচড়ে বসে। অল্প কিছুদিন পর আবারও সেই আগের অবস্থায় চলে যায়। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে শনির আখড়া আর এস শপিং কমপ্লেক্সের সামনে ধূমপানের প্রতিবাদ করার জের ধরে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে আরাফাত ইয়াসিন নামে এক যুবক নিহত হন। এ ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের ৬ জন সদস্য পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলেও এর নেপথ্যের গডফাদাররা আড়ালে রয়ে গেছে।

এ ব্যাপারে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখার অতিরিক্ত উপ-কমিশনার ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, যারা এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের একটা নামের তালিকা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে কেউ যদি অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য মিলছে, সে ক্ষেত্রে ঐ কিশোরের অভিভাবকদের ডেকে এনে সতর্ক করে দেওয়া হচ্ছে। কোনো কিশোর অপরাধ করে, বিদ্যমান আইনে তাকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার এ কে খন্দকার আল মঈন বলেন, এই মুহূর্তে কিশোর গ্যাং কালচার ভয়ংকরভাবে বেড়ে গেছে। র‌্যাব ঢাকা ও চট্টগ্রামের ব্যাটালিয়নগুলোতে এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিশোর গ্যাংদের পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে। এই কিশোর গ্যাংদের গডফাদার রয়েছে। ঢাকায় ৫০ জন গডফাদার রয়েছে। ঢাকার বাইরে ধরলে গডফাদারদের সংখ্যা হবে শতাধিক।

কারা কিশোর গ্যাং :পরনে টি-শার্ট, জিন্স প্যান্ট। চোখে সানগ্লাস। চুলে নিত্য নতুন স্টাইল। পাড়া, মহল্লা, অলিগলি ও ফুটপাতে জমিয়ে আড্ডা দেয় তারা। প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে দামি লাইটার দিয়ে হিরোদের মতো সিগারেটে দেয় টান। উচ্চ স্বরে গান করে। হিন্দি, ইংরেজি গান। মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার ক্ষেত্রে কোনো বয়স বিবেচনা নেই। রাত বাড়লেই অভিজাত এলাকায় শুরু হয় এমন ডিসকো পোলার মোটর ও কার রেসিং। এলাকা ভেদে এদের রয়েছে পৃথক গ্রুপ। একেকটি গ্রুপকে ‘গ্যাং’ বলা হয়। লাড়া দে, ডিসকো বয়েজ, নাইন স্টার, ফিফটিন, ব্ল্যাক রোজ, ক্যাসল বয়েজ, ভাইপারসহ এরকম শতাধিক নামে গ্রুপের কয়েক হাজার কিশোর গোটা রাজধানী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

এরা কিশোর বলে দণ্ডবিধিতে পুলিশ এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। ১৮ বছর পর্যন্ত বয়সের কেউ অপরাধ করলে তাকে দণ্ডবিধিতে কোনো বিচারকার্য সম্পাদন করা যাবে না। তাদের আটক করে শিশু-কিশোর সংশোধনাগারে পাঠাতে হবে। অথচ ঢাকার শিশু আদালতের বিচারিক কার্যক্রমের নথি অনুযায়ী গত ১৫ বছরে রাজধানীতে কিশোর গ্যাং কালচার ও সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে ১১৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে।

সমাজ বিজ্ঞানীরা যা বলেন : মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নুরজাহান খাতুন বলেন, কিশোরদের মধ্যে ‘অ্যাডভেঞ্চার ফিলিং’ বা ‘হিরোইজম’ ভাব দেখা যায়। কিশোর বয়সে এমন একটা পরিবেশে বেড়ে ওঠে সেখানেই অপরাধী হয়ে উঠতে সহায়তা করে। তারা এই বয়সে এমন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করে বা ফলো করে, সেখান থেকেই তারা অপরাধের দিকে ধাবিত হয়। কিশোরদের গ্যাং কালচার থেকে ফিরিয়ে আনতে শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, ঘটনা ঘটলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর সব কিছু ছেড়ে দেই এটা ঠিক নয়। কারণ কিশোরদের জীবন ব্যবস্থাকেন্দ্রিক এক ধরনের অপরাধ। সে ক্ষেত্রে পরিবারগুলোকে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হবে। কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে থানায় যেসব মামলা বা তথ্য নথিভুক্ত হয়, সেটি কিশোর অপরাধ বলে কোনোভাবে কম গুরুত্ব দিয়ে দেখার সুযোগ নাই। কারণটা হলো, কিশোররা এখন প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কারণে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। নিজ দেশের সামাজিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে কিশোররা উদাসীন হয়। অনেক বিষয় তারা মানতে চায় না। এই যে মানতে চায় না এই জায়গা থেকে তাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা বা নৈরাজ্য তৈরি করার একটা প্রবণতা তৈরি হয়। এই জায়গাগুলোতে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের কার্যক্রম বাড়াতে হবে। তিনি আরো বলেন, করোনায় কিশোরদের মধ্যে একটা অস্থিরতা আছে। অস্থিরতার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মধ্যে একটা দায়িত্ব রয়েছে।

নানা নামে কিশোর গ্যাং : গত ২২ মে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে দুই কিশোর গ্যাং গ্রুপের ১১ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা স্থানীয় ‘পাটালি’ ও ‘অ্যালেক্স ইমন’ গ্রুপের সদস্য। র‌্যাবের পক্ষ থেকে রাজধানীতে সক্রিয় এলাকাভিত্তিক ৫০টি গ্যাংয়ের সুনির্দিষ্ট তালিকা করা হয়েছে। এই ৫০টি গ্যাংয়ের ৫০ জন গডফাদার রয়েছে। যেসব গ্যাংয়ের তালিকা করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে আছে পাওয়ার বয়েজ, ডিসকো বয়েস, বিগ বস, নাইন স্টার, নাইন এমএম বয়েস, এনএনএস, এফএইচবি, জিইউ, ক্যাকরা, ডিএইচবি, ব্ল্যাক রোজ, রনো, কে-নাইন, ফিফটিন গ্যাং, পোটলা বাবু, সুজনা ফাইটার, আলতাফ জিরো, ক্যাসল বয়েজ, ভাইপার, তুফান, থ্রি গোল, শাহীন-রিপর এবং নামিজ উদ্দিন গ্যাং, বিহারী রাসেল গ্যাং, বিচ্চু বাহিনী, পিচ্চি বাবু ও সাইফুল গ্যাং ইত্যাদি।

চট্টগ্রামসহ অন্য এলাকার গ্যাং গ্রুপ : চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও খুলনায় রয়েছে অর্ধশত কিশোর গ্যাং গ্রুপ। চট্টগ্রাম শহরে রয়েছে অন্তত ছয়টি গ্যাং। চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার, ফয়েজ লেক, মেডিক্যাল হোস্টেল, শিল্পকলা একাডেমি, সিআরবি, খুলশি, ডেবারপার, চান্দগাঁও শমসের পাড়া, ফরিদের পাড়া, আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনি, সিডিএ, ছোটপুল, হালিশহর, বন্দর কলোনিসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের একাধিক গ্রুপ।

 

সূত্র- ইত্তেফাক


-->


সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক: আবু সুফিয়ান
চেয়ারম্যান: মুসলিমা সুফিয়ান

কল: 01723-980255,01919-972103
নিউজ রুম :01710-972103
ইমেল: Photonews24@yahoo.com

১২মধ্য বেগুনবাড়ি,তেজগাঁও শিল্প এলাকা,ঢাকা -১২০৮
ইমেল: shufian707@gmail.com