রবিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২১


কঙ্গো হবে ‘সৌদি আরব’




ফটো নিউজ ২৪ : 23/11/2021


-->

করোনার পরপরই গোটা দুনিয়ায় শুরু হয়েছে এক ইঁদুর দৌড়। তেল দিয়ে আর বেশি দিন ঘোরানো যাচ্ছে না বিশ্ব অর্থনীতির চাকা। লাগবে বেশি বেশি ব্যাটারি। ব্যাটারির জন্য চাই কোবাল্ট। আবার বিশ্বজুড়ে আচমকা যে মাইক্রোচিপ সংকট দেখা দিয়েছে, সেটার জন্যও লাগবে ওই খনিজটা। এ কারণে ইদানীং কোবাল্টকে বলা হচ্ছে ‘নতুন তেল’। সেই সূত্রে মানচিত্রে নতুন ‘সৌদি আরব’ হয়ে জেঁকে বসার চেষ্টায় আছে ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো।

যুক্তরাষ্ট্রের ভুল?

জ্বালানি বা খনিজের বেলায় হিসাবটা সরল। যার সঙ্গে চুক্তি হবে, সম্পদ তার। আর খনিজের চুক্তি মানেই তো বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য। ডলারের পাহাড় নিয়ে বসে থাকা চীনের হাতে তাই চলে যাচ্ছে কঙ্গোর বিপুল পরিমাণ কোবাল্ট।

২০১৬ সালের কথা। তখন না ছিল করোনা, না ছিল তেল-সংকট। কম দামে চীনের কারখানা থেকে মাইক্রোচিপও পাওয়া যাচ্ছিল। যে কারণে কঙ্গোর কোবাল্ট ও কপার খনির ওপর কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রভাব ছিল সেটা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায়নি একটি মার্কিন কোম্পানি। ওই বছরই প্রতিষ্ঠানটি তাদের যাবতীয় ব্যবসা হস্তান্তর করে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে। আর ওই সময় থেকেই মূলত কঙ্গোর খনিজের ওপর মার্কিন খবরদারিটা চলে যায়। সুযোগ বুঝে চীনের চিপ নির্মাতারাও কঙ্গোতে থাকা চাইনিজ খনি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তির কাজ সেরে ফেলে। কোবাল্ট থেকে মাইক্রোচিপ; প্রযুক্তিপণ্য ও ব্যাটারির কাঁচামালের ওপর এখন চীনেরই একচেটিয়া আধিপত্য।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের মহাযজ্ঞ

জলবায়ু নিয়ে এখন একটু বেশিই মাতামাতি হচ্ছে। বৈদ্যুতিক গাড়িতেই ভবিষ্যৎ দেখছে নানা দেশের সরকার। ওই গাড়ির জন্য লাগবে টেকসই ব্যাটারি। মোবাইল ফোনের লিথিয়াম আয়ন দিয়ে কাজ হবে না। গাড়ির ব্যাটারির জন্য চাই চকচকে কোবাল্ট। রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, সেই কোবাল্টের ৭০ ভাগ পড়ে আছে কঙ্গোতে। এ নিয়ে বিস্তর খাটাখাটনি করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে নিউ ইয়র্ক টাইমস। প্রতিবেদনটি তৈরিতে তারা অন্তত তিনটি মহাদেশের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছে। আর্থিক, কূটনৈতিকসহ সহস্রাধিক পৃষ্ঠার নথিও যাচাই করেছে মার্কিন গণমাধ্যমটি। তাতেই মূলত উঠে আসে কোবাল্ট নিয়ে চীন ও আমেরিকার খেলার খবর এবং অবশেষে পাওয়া যায় যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়ের ‘ম্যাচ রিপোর্ট’।

মরিয়া চীন কী করবে?

গত বছরের হিসাব বলছে, কঙ্গোতে থাকা ১৯টি কোবাল্ট খনির ১৫টিই এখন চীনা মালিকানায়। কাগজপত্রে ব্যক্তিগত বা পাবলিক কোম্পানি হিসেবে দেখালেও সেগুলোতে বিনিয়োগের মূলে আছে চীন সরকার। কঙ্গোর চাইনিজ খনি প্রতিষ্ঠানগুলো সম্প্রতি চীন সরকারের কাছ থেকে ১২শ’ কোটি ডলারের ঋণও পেয়েছে। খনি সামলাচ্ছে এমন বড় পাঁচটি কোম্পানিতেই চীন সরকারের ঋণ আছে প্রায় ১২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। এদের মধ্যে চায়না মলিবডেনাম নামের প্রতিষ্ঠানটিই ২০১৬ সালে একসঙ্গে দুটো বড় মার্কিন খনি কোম্পানি কিনে ফেলেছিল। স্টক এক্সচেঞ্জে ওরা নিজেদের খাঁটি পাবলিক কোম্পানি দাবি করলেও নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে দেখা গেলো, তাদের ২৫ শতাংশ বিনিয়োগই চীনের এক প্রাদেশিক সরকারের।

মোটকথা, চীন যেকোনও মূল্যে কাগুজে নোট বিলিয়ে নিজেদের দখলে এনেছে ভবিষ্যতের কারেন্সি- কোবাল্ট। পরবর্তী কয়েক বছর কিংবা দশক না পেরোতেই হয়তো বোঝা যাবে ওই কোবাল্টের স্তূপে বসে চীন ঠিক কী করবে? বৈদ্যুতিক গাড়ি ও প্রযুক্তি বাজারে চুটিয়ে ব্যবসা করবে? নাকি সম্পদ হাতে রেখে কোনও না কোনোভাবে চেষ্টা চালাবে ছড়ি ঘোরানোর।

বাইডেনপুত্রের যোগ

২০১৬ সালে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কোবাল্ট প্রতিষ্ঠান ছিল আমেরিকার ফ্রিপোর্ট-ম্যাকমোরান। কোম্পানিটাকে ৩৮০ কোটি ডলারে কিনে নেয় চায়না মলিবডেনাম। এই কেনাবেচায় অনুঘটকের কাজ করেছিল একটি চাইনিজ ইকুইটি প্রতিষ্ঠান। ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা-বোর্ড সদস্য ছিলেন হান্টার বাইডেন ওরফে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের পুত্র। তার নিয়ন্ত্রণাধীন একটি কোম্পানির কিছু শেয়ার আছে ওই চীনা ইকুইটি ফার্মে। এদিকে বাইডেনপুত্রের আইনজীবী নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, এখন আর ওই খনির প্রতি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনও আগ্রহই নেই হান্টার বাইডেনের। হোয়াইট হাউজকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল—চীনের কাছে হান্টারের খনি বেচে দেওয়ার বিষয়টা প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জানতেন কিনা। উত্তর আসে, ‘না, জানতেন না।’ ঘটনা ২০১৬ সালের হওয়ায় এ নিয়ে আর তেমন হইচই করেনি মার্কিন মিডিয়া।

বাইডেনের শেষ চেষ্টা

খনি বিক্রি করাটা যে খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ ছিল না, সেটাকে যতটা সম্ভব চেপে রাখতেই সম্ভবত মার্কিন সরকার এখন ডলারের জোয়ারে ভাসাতে চাইছে বিদ্যুৎচালিত কার ও ক্লিন এনার্জি খাতকে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য সিনেটে পাস হতে চলেছে ৩২ হাজার কোটি ডলারের কর ছাড়ের বিল। পাশাপাশি সবুজ জ্বালানির পেছনে কোনও না কোনোভাবে ব্যয় করতে যাচ্ছে আরও ১১ হাজার কোটি ডলার।

এতে চাপ পড়ছে ইলেকট্রনিক ভেহিক্যাল (ইভি) নির্মাতাদের ঘাড়ে। শুধু ডলারে কি আর ইঞ্জিন চলবে? ফোর্ড ও জেনারেল মোটরস এখনই হন্যে হয়ে দৌড়াচ্ছে কোবাল্টের পেছনে। ব্যাটারির পাশাপাশি বৈদ্যুতিক গাড়ির সেমিকন্ডাক্টর তৈরিতেও যে এই খনিজের বিকল্প নেই।

‘জাতি হিসেবে আমরা খানিকটা পিছলে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়েছিলাম, যখন কিনা চীন ও বাদবাকি বিশ্ব বসে ছিল না।’ নিজেদের পরাজয় স্বীকার করে বাইডেন ফের আশ্বাস দিলেন, ‘তবে আমরা আরও বড়… আরও বড় করে ঘুরে দাঁড়াবো।’

কিন্তু বাইডেনের এমন আশ্বাসে হালে পানি দেখছে না ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি। তাদের মতে, ২০৩০ সাল নাগাদ জলবায়ু রক্ষায় যে পরিমাণ ব্যাটারি লাগবে, বর্তমান খনিগুলো বড়জোর সেটার অর্ধেক কাঁচামাল সরবরাহ করতে পারবে।

কঙ্গো কী ভাবছে?

কঙ্গো সরকার এরইমধ্যে বুঝে গেছে ট্রাম্প কার্ড এখন তাদের হাতে। চীনা কোম্পানিগুলোকেও তারা শাসিয়েছে ভালোমতো। খনির পরিবর্তে কঙ্গোর অবকাঠামোগত যেসব উন্নয়ন করার কথা, চীন নাকি সেসব করছে না। আবার শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়েও তাদের খুব একটা মাথাব্যথা নেই। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট জোসেফ কাবিলা সহজ শর্তেই চীনের হাতে খনি তুলে দিয়েছিলেন। তার কথা ছিল, খনির বিনিময়ে চীনকে রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল এসব বানিয়ে দিতে হবে।

কিন্তু আল জাজিরার খবরে বোঝা গেলো, কঙ্গোর বর্তমান প্রেসিডেন্ট ফেলিক্স শিসেকেদি খানিকটা কূটনীতি জানা লোক বটে। গত ২০ নভেম্বর তিনি বলেছেন, তার দেশের খনিজ সম্পদগুলোর পুরোপুরি হিসাব-নিকাশ না হওয়া পর্যন্ত যেন যাবতীয় বাণিজ্য বন্ধ রাখা হয়। রাষ্ট্রীয় বাজেটে কোবাল্ট ও কপারসহ খনিজগুলোর অবদান বাড়াতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের আরও ‘গুছিয়ে’ কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। চীনের সঙ্গে জোসেফ কাবিলা যে ৬০০ কোটি ডলারের অবকাঠামোগত উন্নয়নের চুক্তি করেছিলেন, সেটাও পুনরায় যাচাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

পরিশেষে—নতুন বিশ্বের নতুন জ্বালানির খেলায় নিজেদের দারুণ মিডফিল্ডার হিসেবে তুলে ধরতে চলেছে কঙ্গো। মাঠে আক্রমণাত্মক খেলছে চীন। ফোর্ড, টেসলা আর জেনারেল মোটরসকে সঙ্গে নিয়ে সাইডলাইনে বসে বিরস মুখে খেলা দেখছে যুক্তরাষ্ট্র। বাইডেনের আশা, অস্ট্রেলিয়া বা কানাডার কাছ থেকে কিছু কোবাল্ট তো পাবোই। যদি সেটাও না আসে, তবে আশঙ্কা করা যায়, গ্রেট ডিপ্রেশনের ভুতুড়ে ছায়াটা আবার ঢেকে দিতে পারে বড় বড় অর্থনীতির আকাশ।


-->


সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক: আবু সুফিয়ান
চেয়ারম্যান: মুসলিমা সুফিয়ান

কল: 01723-980255,01919-972103
নিউজ রুম :01710-972103
ইমেল: Photonews24@yahoo.com

১২মধ্য বেগুনবাড়ি,তেজগাঁও শিল্প এলাকা,ঢাকা -১২০৮
ইমেল: shufian707@gmail.com