রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০


চীন চায় না রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক ইস্যু হোক!




ফটো নিউজ ২৪ : 26/08/2020


-->

চীন চায় না রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক ইস্যু হোক। কারণ মিয়ানমারে তার জোরালো স্বার্থ আছে। চীন বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ছে।

আবার চীনের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে মিয়ানমার ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে পড়েছে। বিশ্বরাজনীতিতে জোরালো ভূমিকা রাখা চীনও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ব্যর্থ হওয়ার কারণ এভাবেই বিশ্লেষণ করছেন সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট নতুন করে রোহিঙ্গা ঢল শুরুর আগে ২০১৬ সালে যে ঢল নেমেছিল তার পরপরই চীনের বিশেষ দূত বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। বরাবরই চীন প্রত্যাশা জানিয়েছে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এ সংকট সমাধান করবে। দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় ফল না হওয়ায় চীন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে নিয়ে আলোচনা করেছে। সেখানে ইতিবাচক আলোচনা হলেও কার্যত এগুলোর কোনো ফল আসেনি।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কাজ করছেন এমন একজন পশ্চিমা কূটনীতিক গতকাল রবিবার বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের চেষ্টায় চীন যুক্ত হওয়ার পরও পরিস্থিতি আগের মতোই আছে। কোনো পরিবর্তন নেই। বরং সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যাবাসন উদ্যোগে ভাটা পড়েছে। রোহিঙ্গাদের মধ্যেও মিয়ানমারের প্রতি অনাস্থা প্রবল হয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, কভিড মহামারির কারণে মিয়ানমারের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ে বৈঠক, সরাসরি আলোচনা প্রায় বন্ধ। প্রত্যাবাসন চুক্তির শর্ত অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের পরিচয় যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ কয়েক দফায় তালিকা পাঠানোর পর মিয়ানমার কিছু ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করেছে। কিন্তু তারা কবে ফিরবে বা আদৌ ফিরবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

গত তিন বছরে কয়েকবার চীনের মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। কিন্তু একজন রোহিঙ্গাও এখনো প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় ফিরে যায়নি। ফিরে যাওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি ও আস্থা সৃষ্টির দায়িত্ব মিয়ানমারের। কিন্তু মিয়ানমারের ওপর কার্যত সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখা চীনের কৌশলী ভূমিকাও এ ক্ষেত্রে কোনো ‘ব্রেক থ্রু’ আনতে পারেনি।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র আন্দ্রেজ মাহেসিক বলেছেন, ‘২০১৭ সালের আগস্ট মাসে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। এর তিন বছর পর আজও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ আছে এবং নতুন অনেক চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯ মহামারি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে।’

রোহিঙ্গাদের হিসাবে তাদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আজ মিয়ানমারের বাইরে আছে। ইউএনএইচসিআর ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ নিবন্ধন অনুযায়ী কক্সবাজারে অবস্থান করছে প্রায় আট লাখ ৬০ হাজার রোহিঙ্গা। ধারণা করা হয়, এই সংখ্যা আরো অনেক বেশি হতে পারে। গত কয়েক বছরে রোহিঙ্গাদের ওপর ‘জেনোসাইড’সহ নির্যাতন-নিপীড়নের জবাবদিহির প্রক্রিয়া শুরু হলেও প্রত্যাবাসনের কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। এ বছরের শেষ দিকে রোহিঙ্গাদের ছাড়াই জাতীয় নির্বাচন হবে মিয়ানমারে। বড় শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক, আঞ্চলিক ও দ্বিপক্ষীয় নানা স্বার্থ রোহিঙ্গা সংকটকে আরো জটিল করে তুলেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

গত বছর জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফরের সময় রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু তারও কোনো ফল রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। বরং গত এক বছরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তেমন কোনো আলোচনাও হয়নি। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য পশ্চিমা দেশগুলো এ ক্ষেত্রে চীনের অনাগ্রহকেই দায়ী করেছে। জাতিসংঘের অন্য ফোরামগুলোতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রস্তাবের বিরুদ্ধে চীন ভোট দিয়ে আসছে। এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারের মতো চীনেরও যুক্তি—এসব প্রস্তাব সংকট সমাধানে ও মাঠ পর্যায়ের জটিল পরিস্থিতি দূর করতে কোনো ভূমিকা রাখবে না।

বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনাগুলোতেও রোহিঙ্গা ইস্যু তুলেছে। ভারতের অবস্থান হলো, রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ বাসভূমি মিয়ানমারে ফিরে যাওয়াই এ সংকটের সমাধান। রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার পরিবেশ সৃষ্টির অংশ হিসেবে রাখাইন রাজ্যে বেশ কিছু বাড়ি নির্মাণ করেছে ভারত। এ ছাড়া সেখানে রোহিঙ্গাদের জন্য আর্থ-সামাজিক উদ্যোগও নিয়েছে।

বাংলাদেশ, মিয়ানমার—দুই দেশের সঙ্গেই ভারতের সীমান্ত ও নিবিড় সম্পর্ক আছে। ভারত তার ‘প্রতিবেশীই প্রথম’ নীতিতে বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলে থাকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিক সহায়তা, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফেরার পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়তা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশের জোরালো প্রত্যাশা ছিল সুসম্পর্কের এই সময়ে ভারত মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চাপ দেবে। ভারতের শীর্ষস্থানীয় নেতারা মিয়ানমারের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কাছে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু চীনের প্রভাববলয়ে থাকা মিয়ানমারের ওপর ভারতের চাপ সৃষ্টি বাস্তবে কতটা সম্ভব, তা নিয়েও সন্দেহ, সংশয় আছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন ফোরামে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট না দিয়ে ‘অ্যাবস্টেইন’ (কারো পক্ষে ভোট না দেওয়া) ভোট দিয়ে আসছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভারতীয় কূটনীতিকদের যুক্তি, ভারত প্রস্তাবগুলোর বিরুদ্ধে ভোট দেয়নি। কিন্তু ‘কান্ট্রি স্পেসিফিক (কোনো দেশকে নির্দিষ্ট করে)’ প্রস্তাবকে ভারত সমর্থন করে না। অতীতে অন্য প্রস্তাবগুলোর ক্ষেত্রেও ভারত এমনটি করে এসেছে।

ভারতের পররাষ্ট্রসচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা গত সপ্তাহে ঢাকা সফরকালে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকটের প্রসঙ্গ তুলে সহযোগিতা চেয়েছে। পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেছেন, ‘আগামী বছর জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে ভারত নিরাপত্তা পরিষদে বসবে। সেখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচিত হয়। আমাদের একটি উদ্বেগের বিষয় আছে। তা হলো রোহিঙ্গা ইস্যু। অতীতে আমরা অনেক চেষ্টা করেছি, যাতে নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাব পাস করা যায়। কিছু স্থায়ী সদস্যের এই ব্যাপারে আপত্তির কারণে আমরা করতে পারিনি। আমরা ভারতের কাছে সার্বিক সহযোগিতা চেয়েছি।’

পররাষ্ট্রসচিব বলেন, দ্বিপক্ষীয়ভাবে মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। অবকাঠামোসহ বেশ কিছু জিনিস তারা তৈরি করে দিচ্ছে রাখাইন রাজ্যে। তিনি বলেন, ‘ভারত আমাদের অঞ্চলকে ভালো জানে এবং দুই দেশের সঙ্গে যেহেতু সম্পর্ক আছে, বিশেষ করে, বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের যে বর্তমান গভীর সম্পর্ক আছে, সেটার আলোকে তারা আমাদের সাহায্য করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।’

রোহিঙ্গা সংকটে রাশিয়ার অবস্থানও চীনের কাছাকাছি। রাশিয়াও বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের কথা বলেছে। জাপানও এ সংকটের সমাধান চায়। কিন্তু মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির মতো অবস্থায় তারা নেই।

পশ্চিমা দেশগুলো রোহিঙ্গা নিপীড়নের জবাবদিহির উদ্যোগকে সমর্থন করলেও পরিবেশ সৃষ্টি করা ছাড়া প্রত্যাবাসন শুরুর ঘোর বিরোধী। মিয়ানমারে পরিস্থিতি অনুকূল সৃষ্টি হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা কার্যত এই বোঝা বাংলাদেশেই রাখার পক্ষে। মিয়ানমারের ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে তারা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মতো কিছু ব্যবস্থা নিলেও তা কতটা কাজে আসবে তা নিয়েও সন্দেহ আছে। পশ্চিমা কূটনীতিকদের অনেকের ধারণা, তাঁদের নতুন চাপ মিয়ানমারকে আরো চীনের দিকে ঠেলে দেবে এবং এর ফল উল্টো হবে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নতুন করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে পশ্চিমা দেশগুলোর আহ্বান নাকচ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন। তিনি পশ্চিমা দেশগুলোকেই রোহিঙ্গাদের নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

আঞ্চলিক, আন্তর্জাতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন মনে করেন, এই সংকটের পেছনে আঞ্চলিক, আন্তর্জাতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে এবং এগুলো বিভিন্ন দেশকে অবস্থান নিতে ও অবস্থান বদলাতে ভূমিকা রাখছে। গতকাল কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় হিসেবেই দেখা হচ্ছে। চীন যখন ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের কথা বলেছিল, তখন কিন্তু তা আর খুব একটা অনুসরণ করা হয়নি। কাজেই বিষয়টি বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ইস্যু নয়। চীন এখানে তৃতীয় পক্ষ। তিনি বলেন, চীন মিয়ানমারকে চাপ দিলে সংকট সমাধান হয়ে যাবে, এটি মনে করা কিন্তু ভুল হবে। এটি কেবল চীন নয়, আরো যে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো আছে তাদের সবাইকে নিয়ে কাজ করতে হবে। বহুপক্ষীয় বা দ্বিপক্ষীয় দুইভাবেই এটি মোকাবেলা করা যায়।

চীন সমঝোতার উদ্যোগ নিচ্ছে আবার নিরাপত্তা পরিষদে ইস্যুটি তুলতে দিচ্ছে না—এমন ভাবনা প্রসঙ্গে অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, শুধু চীন তুলতে দিচ্ছে না—এমন নয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য—তারাও কিন্তু তুলতে দিচ্ছে না। তিনি বলেন, কিছুদিন আগেও ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের নিয়ে নিতে। যুক্তরাজ্য কিন্তু হংকংয়ের অধিবাসী যারা, তাদের অনায়াসে নিয়ে নিতে চাচ্ছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের নেওয়ার জন্য আমাদের ওপর চাপ দিচ্ছে। কাজেই রোহিঙ্গা ইস্যুর খুব তাৎপর্যপূর্ণ কিছু দিক আছে। এই রোহিঙ্গারা এমন একটি জনগোষ্ঠীতে পরিণত হচ্ছে, তাদের কার্যত কেউ নিতে চাচ্ছে না। আবার ইন্দোনেশিয়ায় স্থানীয় জনগণ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। এখানে বড় শক্তিগুলোর দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক, বহুপক্ষীয় অনেক খেলা চলছে।

আঞ্চলিক সমীকরণের উদাহরণ দিতে গিয়ে অধ্যাপক ইয়াসমিন বলেন, প্রথম রোহিঙ্গা সংকট থেকে ভারতের ভূমিকা দিন দিন বদলেছে। শেষ পর্যায়ে, অর্থাৎ এ বছর মার্চ মাস থেকে এবং আরো স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, গত জুন মাসের শেষে ভারত বারবার রোহিঙ্গা সংকট সমাধান করতে বলেছে। এখানে বাংলাদেশেরও ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ও চীনের প্রভাব কাজ করেছে। যে কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের সুরও বদলেছে।

 

-কালের কণ্ঠ


-->


সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক: আবু সুফিয়ান
চেয়ারম্যান: মুসলিমা সুফিয়ান

কল: 01723-980255,01919-972103
নিউজ রুম :01710-972103
ইমেল: Photonews24@yahoo.com

১২মধ্য বেগুনবাড়ি,তেজগাঁও শিল্প এলাকা,ঢাকা -১২০৮
ইমেল: shufian707@gmail.com