বৃহস্পতিবার , ১৪ মে ২০২০


কোভিড-১৯-এ মুসলমানদের প্রতি ওআইসির নির্দেশনা




ফটো নিউজ ২৪ : 13/05/2020


-->

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী নভেল করোনাভাইরাসের বিস্তৃতি ও অসংখ্য মানুষের মৃত্যুতে উদ্বিগ্ন সারা দুনিয়ার মানুষ। এরই প্রেক্ষাপটে ওআইসির আন্তর্জাতিক ইসলামিক ফিকাহ একাডেমি এক মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই সংস্থা গত ১৬ এপ্রিল ‘নভেল করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) ও এর চিকিৎসা সম্পর্কে শরিয়ার বিধান’ শীর্ষক একটি ভিডিও কনফারেন্সের আয়োজন করে।

এতে অংশগ্রহণ করেন সৌদি আরবের পাঁচজন খ্যাতনামা চিকিৎসাবিদ, পাঁচটি দেশের শীর্ষস্থানীয় ফিকাহ বিশেষজ্ঞ এবং ফিকাহ একাডেমি ও অন্য সংস্থার শীর্ষস্থানীয় সদস্যবৃন্দ। ওআইসির মহাসচিব ড. ইউসুফ আল উসাইমিন বলেন, করোনা মহামারির এই কঠিন সময়ে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সারা দুনিয়ার মানুষ একটি চরম ভীতির মধ্যে রয়েছে। মানবতার বিপর্যয়ের এই দুর্দিনে ওআইসি সদস্য দেশগুলোর জন্য একটি সমন্বিত উদ্যোগ ও দিকনির্দেশনা খুবই প্রয়োজন। এ জন্যই অনুষ্ঠিত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ এই সম্মেলন, যেখানে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে মেডিসিন এবং শরিয়া বিশেষজ্ঞরা তাঁদের সুচিন্তিত মতামত পেশ করেছেন। এসব মতামত ও পরামর্শের আলোকে একটি সুপারিশমালা তৈরি করা হয়েছে। নিম্নে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হলো।

করোনার সংজ্ঞা : কভিড-১৯ শ্বাসজনিত একটি সংক্রামক ব্যাধি। ২০১৯ সালে এই রোগটির প্রাদুর্ভাব হয়েছে, যার উৎপত্তি করোনাভাইরাস থেকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২০ সালের ১১ মার্চ রোগটিকে বিশ্ব মহামারি হিসেবে ঘোষণা করেছে। ধারণা করা হয়, প্রাণী থেকে (বাদুড় বা প্যাংগুলিন) মানবদেহে এটির বিস্তার ঘটেছে। তবে এর প্রকৃত রহস্য এখনো পরিষ্কার নয়। এই ভাইরাসটি মানুষ থেকে মানুষে সহজেই সংক্রমিত হয়। এই রোগটির সাধারণ দৃশ্যমান লক্ষণগুলো হলো—জ্বর, সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্ট। রোগটি এক সপ্তাহ বা তার বেশি সময়ের মধ্যে মানুষের শরীরে প্রকাশ পায় এবং একসময় তা ক্ষিপ্রতা লাভ করে। রোগটি চরম আকার ধারণ করলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রোগীর নিবিড় স্বাস্থ্য পরিচর্যা বা চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। বিশ্বব্যাপী এই রোগে মৃত্যুর হার ২ থেকে ৩ শতাংশ ধরা হলেও দেশভেদে এই হারের ব্যতিক্রম দেখা যায়। এই পর্যন্ত এই রোগের কোনো টিকা আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। এই রোগের সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য শুধু প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনাই এখন কার্যকর রয়েছে। যেমন—হাত ধোয়া, হাঁচির সময় নাক ও মুখ ঢাকা ও সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা। এই রোগের গতি-প্রকৃতি নিয়ে এখনো সবার ধারণা অস্পষ্ট। কেননা রোগটি প্রতিনিয়ত এর প্রকৃতি বদল করছে বলে মনে করা হচ্ছে। আর এ কারণেই রোগটির দমন ও প্রতিরোধ কঠিন হয়ে পড়েছে। ইসলামী শরিয়া এ ধরনের কঠিন সময় মোকাবেলা করার জন্য এবং তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বিভিন্ন বিধান দিয়েছে। কোনো কিছু করা যদি অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং তা একটি জরুরি অবস্থার মধ্যে পতিত হয়, তখন আল্লাহ তা থেকে অব্যাহতি পেতে নিষিদ্ধ বিধানের জন্য দায়মোচন বিধান দিয়েছেন, যা সেসব কঠিন পরিস্থিতি শেষ হওয়া পর্যন্ত অকার্যকর থাকে। এসব বিধান আল্লাহর বান্দাদের প্রতি তাঁর বিশেষ রহমত, করুণা ও উদারতার প্রমাণ বহন করে। এ প্রসঙ্গে ইসলামী আইনবিদরা কঠিন পরিস্থিতি বা দুর্যোগের সময় কতগুলো বিধান মনে রাখার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। ১. দুর্যোগ উতরিয়ে উঠতে ধৈর্যধারণের প্রশিক্ষণ। ২. দুর্যোগের পর আছে প্রশান্তি। ৩. জীবন বাঁচানোর প্রশ্নে বিশেষ দায়িত্ব পালন। ৪. শাসকদের সিদ্ধান্ত জনগণের স্বার্থের অনুকূলে থাকবে। ৫. জনগণের স্বার্থে নির্দিষ্ট এলাকায় শাসকরা অনুমোদিত বিষয়গুলোর ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করতে পারেন।

মুসলমানরা রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অবশ্যই সম্ভাব্য সব চেষ্টা করবে। ইসলামী বিধান আমাদের নির্দেশ দেয় যে জীবনের ক্ষতি থেকে আমরা সুরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করব। প্রতিটি মানুষ তার জীবন রক্ষার অধিকার সংরক্ষণ করে। ইসলামী বিধান হলো, অসুস্থ হওয়ার আগেই সে তা প্রতিরোধ করবে এবং আর অসুস্থ হলে সে চিকিৎসা গ্রহণ করবে। আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘হে আল্লাহর বান্দারা, তোমরা প্রতিকার গ্রহণ করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন কোনো রোগ দেননি যার কোনো আরোগ্য দেননি। শুধু বার্ধক্য ছাড়া।’ (সহিহ বুখারি, মুসলিম, মুসনাদে ইমাম আহমাদ)

এখানে মানব সত্তার সংরক্ষণ বা জীবন রক্ষা শরিয়ার একটি মৌলিক উদ্দেশ্য। অন্যান্য উদ্দেশ্য হলো বিশ্বাস, মেধা, সন্তান-সন্ততি (জীবন) এবং সম্পদের সংরক্ষণ। মহান আল্লাহ সুরা মায়েদার ৩২ নম্বর আয়াতে বলেন, ‘যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করা কিংবা জমিনে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন সব মানুষকে হত্যা করল। আর যে তাকে বাঁচাল, সে যেন সব মানুষকে বাঁচাল।’

তাই মহামারির সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা মানুষ চিকিৎসাসেবা এবং প্রাথমিক পরিচর্যা গ্রহণের অধিকার রাখে।

ইসলামী বিধানমতে, তাই কোনো দেশ বা সরকারের পক্ষে জনগণের স্বার্থে কোনো ব্যক্তি বা অঞ্চলের মানুষের স্বাধীনতার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির অধিকার রয়েছে। যেমন—আর্থিক লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ রাখা, সব ধরনের সেবা, স্কুল-কলেজ এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার মতো নিষেধাজ্ঞাও হতে পারে। তাই মহামারির সময় এটি খুব জরুরি যে, রাষ্ট্রের সব সিদ্ধান্ত সবাইকে মেনে নিতে হবে। সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করে ভাইরাসের বিস্তার রোধ করতে হবে।

পবিত্রতা বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইসলামের অন্যতম বিধান এবং ইবাদতের শর্ত। ইসলামে এর বহু নির্দেশনা রয়েছে। মহান আল্লাহ সুরা মায়েদার ৬ নম্বর আয়াতে বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা যখন সালাতে দণ্ডায়মান হতে চাও, তখন তোমাদের মুখ ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত করো, মাথা মাসেহ করো এবং টাখনু পর্যন্ত পা ধৌত করো। আর যদি তোমরা অপবিত্র থাকো, তবে ভালোভাবে পবিত্র হও।’ সুরা বাকারার ২২২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং ভালোবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদের।’

আল্লাহর নবী মুহাম্মাদ (সা.) বলেন, ‘পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক।’ তাই এটা খুব জরুরি যে মানুষ ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে পরিচ্ছন্নতার নিয়ম বা বিধান মেনে চলবে এবং তার সুরক্ষার চেষ্টা করবে। বর্তমান বিশ্ব মহামারির এই সংকটকালীন সময়ে ইসলামী শরিয়া সতর্কতার নিয়মগুলো মেনে চলার প্রতি গুরুত্বারোপ করে। যেমন—পানি ও সাবানের মাধ্যমে হাত ধোয়া, মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করা এবং দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘোষিত সব নির্দেশনা যথাযথভাবে মেনে চলা ইত্যাদি।

ইসলামী শরিয়া মতে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আইসোলেশনে (আটকে রাখা) রাখা জরুরি। তা ছাড়া কাউকে ভাইরাসে আক্রান্ত মনে করা হলে, আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তার মধ্যে থাকলে অথবা যেকোনো লক্ষণের একটিও দেখা গেলে তাকেও পরিবার, আত্মীয়-স্বজন এবং সমাজের অন্য মানুষ থেকে আইসোলেশনে (আটকে রাখা) রাখা যাবে। আর এটাও মনে রাখতে হবে যে, কারো মধ্যে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বা লক্ষণ দেখা গেলে সেটি চিকিৎসক অথবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লুকানোর অনুমোদন শরিয়া দেয় না। অধিকন্তু কেউ কারো মধ্যে এই ভাইরাসের লক্ষণ দেখতে পেলে তাকেও সতর্ক হতে হবে এবং এটি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এড়ানোর জন্য সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি অবশ্যই চিকিৎসকের দেওয়া বিধি-বিধান মেনে চলবেন। এর ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি যেমন সংকট থেকে সেরে উঠবেন, তেমনি অন্যরাও এর ভয়াল থাবা বা ধ্বংস থেকে রক্ষা পেতে পারবেন। আল্লাহ তাআলা সুরা বাকারার ১৯৫ নম্বর আয়াতে বলেন, ‘নিজ হাতে নিজেদের ধ্বংসে নিক্ষেপ কোরো না। আর সুকর্ম করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সুকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’

সুরা নিসার ২৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ আরো বলেন, ‘আর তোমরা নিজেরা নিজেদের হত্যা কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে পরম দয়ালু।’

এ প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর কয়েকটি হাদিস রয়েছে। তিনি বলেন, ‘যদি জানতে পারো যে কোনো এলাকায় প্লেগের প্রাদুর্ভাব হয়েছে, তাহলে সেখানে প্রবেশ কোরো না। কিন্তু যদি কোথাও প্লেগের প্রাদুর্ভাব হয়েছে এবং তুমি সেখানে অবস্থান করছ, তাহলে সেখান থেকে বেরিয়ে যেয়ো না।’ (সহিহ বুখারি)

অন্য হাদিসে এসেছে, ‘যারা সংক্রামক রোগে আক্রান্ত তারা সুস্থ মানুষ থেকে দূরে থাকবে।’ (সহিহ মুসলিম)।

আরেক হাদিসে এসেছে, ‘কেউ না ক্ষতিগ্রস্ত হবে, না কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।’ (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)

বরং ধৈর্যসহ আল্লাহর করুণার অপেক্ষা করবে এবং স্মরণ রাখবে যে আল্লাহর আদেশ ছাড়া তার ওপর কোনো কিছুই আপতিত হবে না। আর সে যদি এভাবে মারা যায়, তাহলে সে শহীদের মর্যাদা লাভ করবে। (সহিহ বুখারি)

চিকিৎসক ও ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা একমত যে মানুষের যেকোনো সমাবেশ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই সমাবেশ বা একত্রিত হওয়া থেকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে এবং তা এড়িয়ে চলতে হবে। সুরা নিসার ৭১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তোমাদের সতর্কতা অবলম্বন করো।’

এসব সতর্কতার মধ্যে ইসলামী বিধানও অন্তর্ভুক্ত। শুক্রবারের নামাজ, পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ, তারাবি ও ঈদের নামাজ, হজ ও ওমরাহ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিভিন্ন যাতায়াত পরিবহন স্থগিত রাখা, কারফিউ জারি করা, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলা এবং অন্যান্য সব সমাবেশ বাতিল করা এই নির্দেশনার আলোকে অনুমোদিত।

মসজিদে শর্তসাপেক্ষে যে নামাজ আদায় করা হবে, তা টেলিভিশন, রেডিও ও ইন্টারনেটে সম্প্রচার করতে বাধা নেই। তবে এই সম্প্রচার দেখে দেখে এবং ইমামের কণ্ঠ শুনে দূরবর্তী এলাকায় নামাজ পড়ার কোনো অনুমতি নেই।

রমজানের রোজা প্রসঙ্গে বলা যায়, সাধারণভাবে রোজা স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি করে না। চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যেই এটা নিশ্চিত করেছেন যে রোজার সঙ্গে ভাইরাসের সংবেদনশীলতা বৃদ্ধির যোগসূত্র নেই। তাই এ সময় রমজানের রোজা পালনে কোনো বাধা নেই। অতএব, করোনার কারণে রোজা ছেড়ে দেওয়ার অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়। সক্ষম ও সুস্থ প্রতিটি মানুষের রোজা পালন করতে হবে। আর আক্রান্ত রোগী ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা কখন বা কিভাবে রোজা রাখবেন—তা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিপালন করবেন।

করোনা মহামারির কারণে যেসব লোক মৃত্যুবরণ করবে বা ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাদের ও তাদের পরিবারের প্রতি সরকার ও সব জনগণের দায়িত্ব হলো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। মুসলমানরা এই দায়িত্ব পালনে কখনো পিছপা হয় না। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনো তিনি তোমাদের যা কিছুর উত্তরাধিকারী করেছেন, তা থেকে ব্যয় করো। অতঃপর তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও (আল্লাহর পথে) ব্যয় করে, তাদের জন্য রয়েছে বিরাট প্রতিফল।’ (সুরা হাদিদ, আয়াত : ৭)

আল্লাহ তাআলা সুরা বাকারার ২৪৫ নম্বর আয়াতে আরো বলেন, ‘যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে, তিনি তার জন্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেবেন।’

আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘তুমি মুসলমানদের পরস্পরের প্রতি দয়া, সম্প্রীতি ও সহানুভূতি পোষণে একটি দেহের মতোই দেখতে পাবে। দেহের একটি অঙ্গ যদি কোনো রোগে আক্রান্ত হয়, তবে অবশিষ্ট সব কটি অঙ্গ জ্বর ও অনিদ্রার শিকার হয়ে তার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে।’ (সহিহ মুসলিম)

অন্য আরেক হাদিসে তিনি বলেন, ‘মুমিন মুমিনের জন্য প্রাসাদস্বরূপ। এটির একাংশ একাংশকে সুদৃঢ় করে। তারপর তিনি তাঁর আঙুলকে আঙুলে প্রবিষ্ট করে দেখালেন।’ (সহিহ বুখারি)

আল্লাহর রাসুল (সা.) আরো বলেন, ‘মুসলমান মুসলমানের ভাই। তাকে অত্যাচার-নির্যাতনও করে না। তাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেয় না। আর যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করবে, আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দুঃখ-দুর্দশা মোচন করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দুঃখ-দুর্দশা মোচন করবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন করে রাখবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন করে রাখবেন।’ (সহিহ বুখারি)

ইসলামে এক বছরের মধ্যে বা তার বেশি সময়ে দ্রুত জাকাত দিয়ে দেওয়ার অনুমতি রয়েছে। আর এটা যখন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তখনই বিতরণ করা যায়। তা ছাড়া মুসলিম সম্প্রদায়কে কল্যাণকর ঋণ বা সুদবিহীন ঋণ দিয়ে এবং সর্বোচ্চ সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব এবং অসহায় মানুষের প্রয়োজনে সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশে জাকাত ও সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল থেকে সাহায্য করা যায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই সদকা (জাকাত) হচ্ছে ফকির ও মিসকিনদের জন্য এবং এতে নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য, আর যাদের অন্তর আকৃষ্ট করতে হয় তাদের জন্য, (তা বণ্টন করা যায়), দাস আজাদ করার ক্ষেত্রে, ঋণগ্রস্তদের মধ্যে, আল্লাহর রাস্তায় এবং মুসাফিরদের মধ্যে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৬০)

আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, ‘একবার আমরা রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে ভ্রমণ করছিলাম। তখন এক উটচালক এলো এবং ডানে-বাঁয়ে তাকাতে লাগল। তখন রাসুল (সা.) বলেন, ‘কারো ঘোড়া না থাকলে যার অতিরিক্ত আছে তার উচিত তাকে চড়তে দেওয়া এবং যার খাবার নেই তার উচিত যার অতিরিক্ত আছে তা তাকে দেওয়া। এরপর আল্লাহর রাসুল অন্য সম্পদ সম্পর্কেও বলতে থাকেন এবং আমরা তখন বুঝতে পারলাম যে আমাদের কারো অতিরিক্ত সম্পদ রেখে দেওয়ার অধিকার নেই।’ (মুসলিম, আবু দাউদ ও বায়হাকি)

শরিয়া মতে, জাকাতুল ফিতর (ফিতরা) প্রদানও আবশ্যকীয় একটি বিধান। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘জাকাত আল ফিতরা দাও।’ তিনি আরো বলেন, ‘যারা ওই দিন রাস্তায় খাবারের জন্য ঘুরে বেড়ায় তাদের (গরিবদের) রক্ষা করো।’ (বায়হাকি)

এই হাদিসে ঈদুল ফিতরের আগে ফিতরা দেওয়ার আদেশ করা হয়েছে। তবে মহামারির এই সময়ে রমজানের শুরুতেও এই ফিতরা প্রদান করা যেতে পারে।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে যারা মারা যাবে, তাদের মৃতদেহ পানি দিয়ে ধৌত করতে হবে এবং কাপড়ে মুড়িয়ে (কাফন) দাফন করতে হবে। এটা সম্ভব না হলে লাশকে শুকনো অজু (তায়াম্মুম) করানো যেতে পারে। যদি তাও সম্ভব না হয়, তাহলে কাফন পরিয়ে মৃতদেহ দাফন করতে হবে। সম্ভব হলে দাফনের আগে জানাজা নামাজ পড়তে হবে। তবে কোনোভাবেই মৃতদেহ পোড়ানো যাবে না। আর দাফন প্রক্রিয়া শরিয়া মতে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হবে। উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ মৃত্যুবরণ করলে, তাকে দাফন করতে দেরি কোরো না, তাকে কবরস্থ করো।’ (সহিহ বুখারি)

মহামারিতে মৃত্যুবরণকারী কোনো মৃতদেহ রিমোট কন্ট্রোল ডিভাইসের মাধ্যমেও গোসল বা ধৌত করার অনুমতি আছে। তবে এ ক্ষেত্রে শরিয়া প্রণীত সুন্নাহর শর্তগুলো মানতে হবে এবং প্রতিষ্ঠিত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত বিষয়গুলোর প্রতিও খেয়াল রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে মুসলিম পেশাধারীদের এসব ডিভাইস তৈরির জন্য উৎসাহিত করা যেতে পারে।

এই মহামারির সময় সমবেদনা বা সান্ত্বনা দেওয়া জারি রাখতে হবে। এই সান্ত্বনা আক্রান্ত ব্যক্তি ও মৃত্যুবরণকারী পরিবারকে সশরীরে দেওয়া ছাড়াও নানা উপায়ে (ফোন ও ই-মেইল ইত্যাদি) দেওয়া যেতে পারে। রোগের সংক্রমণ এড়ানোর জন্য সশরীরে গিয়ে সান্ত্বনা দেওয়া উচিত নয়।

মহামারির সময় মুসলমান ও মিডিয়াকে ক্ষতিকর গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে। যেকোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া থেকে সমাজের মানুষকে বাঁচানোর জন্য মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন গুজবের বিরুদ্ধে সবাইকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

মহামারি সম্পর্কে সঠিক চিকিৎসাসতর্কতা, ধর্মীয় বিধান ও সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা সব মাল্টিমিডিয়া, প্রকাশনা মাধ্যম এবং সোস্যাল মিডিয়ায় প্রচার করতে হবে। জনগণের উচিত হবে মানুষের হৃদয়ে আশা ও প্রত্যাশার বাতাবরণ তৈরির জন্য বক্তৃতা, রোগ প্রতিরোধবিষয়ক প্রচারপত্র ইত্যাদি প্রচার করা। প্রতিটি রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে এই কাজ চালানো উচিত।

ইসলামী পণ্ডিতদের নির্দেশনা প্রচারের ক্ষেত্রে মতবিরোধ করা থেকে বিরত থাকার প্রতি জোর দিতে হবে। এতে ধর্মীয় ধারণার প্রতি মানুষের সন্দেহ তৈরি হতে পারে এবং ফতোয়া সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। সব দেশের জনগণকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঠিক ফতোয়া মেনে চলতে হবে।

প্রতিটি দেশের সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক ভেন্টিলেটর অবশ্যই সরবরাহ করবেন। চিকিৎসাসেবা প্রদানের বেলায় চিকিৎসকরা চিকিৎসানীতি এবং নৈতিক মান অবশ্যই সঠিকভাবে রক্ষা করবেন। প্রয়োজনীয় ভেন্টিলেটরের অভাব হলে চিকিৎসকরা কোন কাজটি রোগীর জন্য অগ্রাধিকার—তা ঠিক করবেন।

কোনো দেশ বা দাতব্য প্রতিষ্ঠানের কাছে অতিরিক্ত চিকিৎসাসামগ্রী থাকতে পারে বা তাদের সেটি তৈরির সুযোগ থাকতে পারে। মহামারির কবল থেকে বিশ্ব মানবতাকে বাঁচানোর জন্য তারা এসব চিকিৎসাসামগ্রী অন্যান্য দেশ বা সম্প্রদায়কে অবশ্যই দান করা উচিত।

করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কার্যকরী ওষুধ বা টিকার আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত ডাক্তার ও বিজ্ঞানীদের সম্ভব হলে অব্যাহতভাবে গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা অবশ্যই চালিয়ে যেতে হবে। এই গবেষণা অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইন, গবেষণার প্রয়োজনীয় রীতি এবং শরিয়ার বিধানের আলোকে পরিচালিত হবে। এসব কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সব ধরনের সমর্থন ও সাহায্য বা দান আবশ্যক।

সব দেশের সরকার চিকিৎসাসামগ্রীর মূল্য তদারকি করবে, যাতে একচেটিয়া মুনাফার সুযোগ না থাকে এবং এর যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করা যায়। কেননা শরিয়া এ ধরনের মুনাফাখোরিকে গর্হিত কাজ বলে বিবেচনা করে। তা ছাড়া সব প্রয়োজনীয় সামগ্রীর প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ আর্থিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বাজারে প্রয়োজনীয় সামগ্রীর মূল্য বেড়ে যাওয়ার ভয়ে জনসাধারণ তা জমিয়ে রাখতে পারবে না। এটা ইসলামে বৈধ নয়।

এই মহামারির সময়ে বিবাহ কার্যক্রম যথাযথ কর্তৃপক্ষের শর্ত মেনে সম্পন্ন করা যাবে। এর আগে একাডেমির কাউন্সিল অনলাইনে বিবাহ করাকে অবৈধ ঘোষণা করেছে, কারণ এতে সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত হয় না। এই মহামারিকালীন সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে একাডেমি ঘোষিত নির্দেশনার আলোকে উভয় পক্ষ এবং সাক্ষীদের উপস্থিতিতে বিবাহকার্য সম্পাদন করতে হবে। বর ও কনের ন্যূনতমসংখ্যক আত্মীয়-স্বজন নিয়ে এবং চিকিৎসানীতি ও কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে এই কাজটি সম্পন্ন করতে হবে।

কনফারেন্সে উপস্থিত সবাই মহামারি থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন এবং তাঁর কাছে সুরক্ষা কামনা করেন। যারা ইতোমধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, মহান আল্লাহর কাছে তাদের আরোগ্য প্রার্থনা করেন। কারণ, মহান আল্লাহই আরোগ্য দিতে পারেন। তিনি এই বিশ্বের নিয়ন্তা, তাঁর কাছেই রয়েছে ভালো ও মন্দের বিধান। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ সুরা নামলের ৬২ নম্বর আয়াতে বলেন, ‘বরং তিনি, যিনি নিরুপায়ের আহ্বানে সাড়া দেন এবং বিপদ দূরীভূত করেন।’

আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘কোনো মুসলিম ব্যক্তি মানসিক বা শারীরিক কষ্ট পেলে, কোনো শোক বা দুঃখ পেলে অথবা চিন্তাগ্রস্ত হলে সে যদি ধৈর্যধারণ করে, তা হলে আল্লাহ প্রতিদানে তার সব গুনাহ মাফ করে দেবেন। এমনকি যদি সামান্য একটি কাঁটাও পায়ে বিঁধে তাও তার গুনাহ মাফের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

অন্য এক হাদিসে মহানবী (সা.) বর্ণনা করেন, ‘বিশ্বাসী ব্যক্তি আনন্দের সময় আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করে, আর তাতেই রয়েছে তার জন্য কল্যাণ। যখন সে বিপদে পতিত হয়, তখন ধৈর্যধারণ করে, তাতেও তার জন্য রয়েছে কল্যাণ।’ (সহিহ মুসলিম)

পরিশেষে উপস্থিত এবং অংশগ্রহণকারী সদস্যরা সারা দুনিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, চিকিৎসক, নিরাপত্তাকর্মী এবং যাঁরা করোনা মহামারির বিরুদ্ধে লড়াই করছেন, তাঁদের সবার কল্যাণ ও সুস্বাস্থ্যের জন্য মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা করেন। কনফারেন্স আয়োজনে নিয়োজিত সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে তাঁদের নিষ্ঠাবান কাজের জন্য তাঁরা ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

অনুবাদক : সাবেক ডিএমডি, ইসলামী ব্যাংক


-->


সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক: আবু সুফিয়ান
চেয়ারম্যান: মুসলিমা সুফিয়ান

কল: 01723-980255,01919-972103
নিউজ রুম :01710-972103
ইমেল: Photonews24@yahoo.com

১২মধ্য বেগুনবাড়ি,তেজগাঁও শিল্প এলাকা,ঢাকা -১২০৮
ইমেল: shufian707@gmail.com