বৃহস্পতিবার , ১৯ মার্চ ২০২০


বঙ্গবন্ধু ও ধর্মনিরপেক্ষতা




ফটো নিউজ ২৪ : 17/03/2020


-->

আজ ১৭ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মদিন। বঙ্গবন্ধু যেমন ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক বাঙালি, তেমনি ছিলেন একজন প্রকৃত মুসলমান। বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের কর্মপ্রয়াস ছিল বাংলার জনগণের শোষণ ও মুক্তির অন্বেষণ। বড় বিচিত্র, বর্ণাঢ্য আর কীর্তিতে ভরা তার সারাটা জীবন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন উদার চেতনার অধিকারী একজন খাঁটি ঈমানদার মুসলমান। তিনি কখনও ইসলামকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেননি।

বাংলাদেশকে সকল ধর্মের সকল মানুষের জন্য শান্তির দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি ছিলেন সদা সচেষ্ট। বঙ্গবন্ধুর স্বল্পকালীন শাসনামলে দেশ ও জাতির সার্বিক কল্যাণার্থে গৃহীত নানামুখী পদক্ষেপসমূহের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং ভৌত অবকাঠামোগত পদক্ষেপ যেমন ছিল, তেমনি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও মূল্যবোধের বিষয়াদি বিবেচনায় রেখে তিনি ইসলামের প্রচার ও প্রসারে গ্রহণ করেছিলেন বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকরী নানা ব্যবস্থা। তিনি যেমন একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের মহান স্থপতি, তেমনি বাংলাদেশে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামের প্রচার-প্রসারের স্থপতিও তিনি। এ দু’টি অনন্য সাধারণ অনুষঙ্গ বঙ্গবন্ধুর জীবনকে দান করেছে প্রোজ্জ্বল মহিমা।

ইসলামের চিরন্তন মানব কল্যাণকামী বৈশিষ্ট্য ও আদর্শের প্রতিফলন ঘটিয়ে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন ভাষণে মহানবী (সা.)-এর ইসলামের সুমহান শিক্ষা, অন্যায়-অত্যাচার, শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে আপোষহীন অবস্থান, প্রতারণা-প্রবঞ্চনা ও মোনাফেকির বিরুদ্ধে ধর্মের শিক্ষা ও আদর্শের প্রতি তার সুদৃঢ় অঙ্গীকার বাস্তবায়নের নিরলস প্রচেষ্টার কথা সব সময় বঙ্গবন্ধু ব্যক্ত করতেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি সদ্য-স্বাধীন স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর রমনার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের এক বিশাল জনসমাবেশে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, ‘বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ। ইসলামের অবমাননা আমি চাই না।…এ দেশের কৃষক-শ্রমিক, হিন্দু-মুসলমান সবাই সুখে থাকবে, শান্তিতে থাকবে।’

বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রীয়ভাবে সব মানুষের স্ব স্ব ধর্ম পালনের অধিকার সুনিশ্চিত করার জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার উৎস ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রবর্তিত মদিনা সনদের সেই মহান অতুলনীয় শিক্ষা, যেখানে উল্লেখযোগ্য শর্ত ছিল- ‘মদিনায় ইহুদি-খ্রিস্টান, পৌত্তলিক এবং মুসলমান সকলেই নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে।’

১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর খসড়া সংবিধান প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দেন তাতেও ছিল ধর্মনিরপেক্ষতার বাণী। তিনি বলেছিলেন- ‘…আর হবে ধর্মনিরপেক্ষতা। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। হিন্দু তার ধর্ম পালন করবে; মুসলমান তার ধর্ম পালন করবে; খ্রিস্টান, বৌদ্ধ- যে যার ধর্ম পালন করবে। কেউ কারও ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, বাংলার মানুষ ধর্মের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ চায় না। রাজনৈতিক কারণে ধর্মকে ব্যবহার করা যাবে না। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ধর্মকে বাংলার বুকে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। যদি কেউ ব্যবহার করে, তাহলে বাংলার মানুষ যে তাকে প্রত্যাঘাত করবে, এ আমি বিশ্বাস করি।’

১৯৭২ সালে ৪ নভেম্বর পুনরায় জাতীয় সংসদে তিনি বলেন: ‘জনাব স্পীকার সাহেব, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্মকর্ম করার অধিকার থাকবে। আমরা আইন করে ধর্মকে বন্ধ করতে চাই না এবং করবও না। ২৫ বৎসর আমরা দেখেছি, ধর্মের নামে জুয়াচুরি, ধর্মের নামে শোষণ, ধর্মের নামে বেঈমানি, ধর্মের নামে খুন, ধর্মের নামে ব্যাবিচার- এই বাংলাদেশের মাটিতে এ সব চলেছে। ধর্ম অতি পবিত্র জিনিস। পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা চলবে না। যদি কেউ বলে যে, ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়েছে, আমি বলব, ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয় নি। সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করার ব্যবস্থা করেছি’।

ইসলাম ধর্মের মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্ব এটাই যে, ইসলাম প্রত্যেক মানুষকে ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করে। এই স্বাধীনতা কেবল ধর্ম-বিশ্বাস লালন-পালন করার স্বাধীনতা নয় বরং ধর্ম না করার বা ধর্ম বর্জন করার স্বাধীনতাও এই ধর্মীয় স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত। যেভাবে পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তুমি বল, তোমার প্রতিপালক-প্রভুর পক্ষ থেকে পূর্ণ সত্য সমাগত, অতএব যার ইচ্ছা সে ঈমান আনুক আর যার ইচ্ছা সে অস্বীকার করুক’ (সুরা কাহাফ : আয়াত ২৮)।

সত্য ও সুন্দর নিজ সত্তায় এত আকর্ষণীয় হয়ে থাকে যার কারণে মানুষ নিজে নিজেই এর দিকে আকৃষ্ট হয়। বলপ্রয়োগ বা রাষ্ট্রশক্তি নিয়োগ করে সত্যকে সত্য আর সুন্দরকে সুন্দর ঘোষণা করানো অজ্ঞতার পরিচায়ক। ফার্সিতে বলা হয়, আফতাব আমাদ্ দালিলে আফতাব। অর্থাৎ সূর্যোদয়ই সূর্যের অস্তিত্বের প্রমাণ।

এ নিয়ে গায়ের জোর খাটানোর বা বিস্তার অবকাশ নেই। সূর্যোদয় সত্বেও কেউ যদি সূর্যের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে তাকে বোকা বলা যেতে পারে কিন্তু তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কিছুই নেই। ঠিক তেমনি কে আল্লাহকে মানলো বা মানলো না, কে ধর্ম করলো বা করলো না এটা নিয়ে এ জগতে বিচার বসানোর কোন শিক্ষা ইসলাম ধর্মে নেই। বরং এর বিচার পরকালে আল্লাহ্ নিজে করবেন বলে তার শেষ শরীয়ত গ্রন্থ আল কুরআনে বার বার জানিয়েছেন। এ স্বাধীনতা কাজে লাগিয়ে সমাজে আস্তিকও থাকবে, নাস্তিকও থাকবে। মুসলমানও থাকবে হিন্দুও থাকবে এবং অন্যান্য মতাবলম্বীরাও থাকবে।

ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্র পরিচালনার একটি নীতি। যে নীতিকে পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি চেয়েছিলেন প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে। পূর্ণ নিরপেক্ষতা ছাড়া পক্ষপাতহীন ন্যায় বিচার করা যে সম্ভব নয় তা বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন।

ইসলাম ধর্মের এই অমোঘ শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জীবনে। মক্কার নির্যাতিত অবস্থা থেকে মুক্তি চেয়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা লাভের প্রত্যাশায় তিনি মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় পৌঁছানোর পর মদিনার ইহুদী ও অন্যান্য ধর্ম গোষ্ঠী ও গোত্রের সাথে তিনি একটি ‘সন্ধি’ করেন। এই সন্ধি ‘মদিনা সনদ’ নামে বিখ্যাত।

‘মদিনা সনদের’ প্রতিটি ছত্রে সকল ধর্মের ও বর্ণের মানুষের সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। মদিনা রাষ্ট্রের সকল নাগরিককে এক জাতিভুক্ত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। মদিনা সনদের ২৫ নম্বর ধারায় ধর্ম নিরপেক্ষতার একটি বিরল উদাহরণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এতে বলা হয় : ২৫. বনু আওফ গোত্রের ইহুদীরা মুমিনদের সাথে একই উম্মত-ভুক্ত বলে গণ্য হবে। ইহুদীদের জন্য ইহুদীদের ধর্ম, মুসলমানদের জন্য মুসলমানদের ধর্ম। একই কথা এদের মিত্রদের এবং এদের নিজেদের জন্য প্রযোজ্য। তবে যে অত্যাচার করবে এবং অপরাধ করবে সে কেবল নিজেকে এবং নিজ পরিবারকেই বিপদগ্রস্ত করবে।

একটু ভেবে দেখুন, কি চমৎকার শিক্ষা! বিশ্বনবী, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো, যে যে ধর্মেরই হোক না কেন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তাদের জাগতিক অবস্থান সমান। এটি নিছক একটি ঘোষণাই ছিল না। বরং মহানবী (সা.) মদিনার শাসনকাজ পরিচালনাকালে এর সুষ্ঠু বাস্তবায়নও করেছিলেন আর এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামই বঙ্গবন্ধু আজীবন করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার স্বপ্ন পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হলেই রাষ্ট্র ও দেশ হবে সুখি, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ।


-->


সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক: আবু সুফিয়ান
চেয়ারম্যান: মুসলিমা সুফিয়ান

কল: 01723-980255,01919-972103
নিউজ রুম :01710-972103
ইমেল: Photonews24@yahoo.com

১২মধ্য বেগুনবাড়ি,তেজগাঁও শিল্প এলাকা,ঢাকা -১২০৮
ইমেল: shufian707@gmail.com