বৃহস্পতিবার , ১৯ মার্চ ২০২০


করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের চাপে দিশেহারা ইতালির হাসপাতালগুলো




ফটো নিউজ ২৪ : 17/03/2020


-->

প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের চাপে দিশেহারা ইতালির হাসপাতালগুলোতে দেখা দিয়েছে তুমুল বিশৃঙ্খলা।

চিকিৎসা উপকরণ ও শয্যা সংকটের কারণে চিকিৎসরা অনেক রোগীকেই ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন; কাউকে কাউকে ‘সব ঠিক আছে’ বলে মিথ্যা আশ্বাসও দিতে হচ্ছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের এ দেশটির চিকিৎসা ব্যবস্থা আর কখনোই এমন নাজুক সময় পার করেনি বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ।

সোমবার পর্যন্ত দেশটির ২৭ হাজার ৯৮০ জনের কভিড-১৯ শনাক্ত হয়েছে; মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছে ২ হাজার ১৫৮-তে।

ভাইরাসটির সংক্রমণ যত বিস্তৃত হচ্ছে, শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে আসা ব্যক্তিদের সংখ্যাও ততই বাড়ছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক নিবিড় পর্যবেক্ষণ ইউনিট, উপকরণ ও কর্মীর ঘাটতির কারণে তাদের সবাইকে ভর্তি করা যাচ্ছে না।

বেছে বেছে তাদেরই ভর্তি করা হচ্ছে, যাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি। বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে বয়স, পূর্ববর্তী মেডিকেল রেকর্ড ও পরিবারের সদস্যসংখ্যা।

“বৃদ্ধ রোগীদের পরিবারে কেউ আছে কিনা তাও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে আমাদের; কেননা নিবিড় পর্যবেক্ষণ ইউনিট থেকে ফেরার পরও তাদের সাহায্যের প্রয়োজন পড়বে,” বলেছেন পলিক্লিনিকো সান দোনেতোর ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের উপপ্রধান মার্কো রেস্তা।

তার ইউনিটে এখন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ২৫ জন রয়েছে। এরা সবাই সংকটাপন্ন, সবাইকে অচেতন করে রাখা হয়েছে, শ্বাস প্রশ্বাস ঠিক রাখার জন্য প্রত্যেকের মুখে লাগানো রয়েছে টিউব।

প্রতিদিন দুপুর ১টার দিকে চিকিৎসকরা এ রোগীদের পরিবারের সদস্যদেরকে ফোন করে সর্বশেষ অবস্থা জানান।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকা প্রতি দুইজন্ কভিড-১৯ রোগীর একজন মারা যাওয়ায় চিকিৎসকরা পরিবারের সদস্যদের এ সময় রোগীর সত্যিকারের পরিস্থিতিটুকুই অবহিত করেন বলে জানান রেস্তা।

মিলানের এ হাসপাতালে আগে দুপুরের এ সময় খাবার বিরতি থাকতো, দর্শণার্থীরাও এই সময়েই হাসপাতালে আসতেন। তবে কয়েক সপ্তাহ ধরে সে চিত্র বদলে গেছে। পুরো ইতালিই এখন অবরুদ্ধ, হাসপাতালে দর্শণার্থী প্রবেশে অনুমতি নেই; কেউই এখন আর ঘরের বাইরে যাচ্ছেন না।

ইতালির হাসপাতালগুলোতে এখন নিবিড় পর্যবেক্ষণ ইউনিটের বেডগুলোর চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। যখনই কোনো বেড খালি হচ্ছে, দুই অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট দুই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে তাৎক্ষণিকভাবে রোগীদের মধ্য থেকে বাছাই করে নতুন একজনকে সেখানে তুলে নিচ্ছেন।

যাদের সেরে ওঠার সম্ভাবনা কম বলে মনে হয়, তাদেরকে মিথ্যা আশ্বাসের ওপর রাখা হয়।

“রোগীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে হয়, সব ঠিক আছে,” বলেন রেস্তা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেখা সবচেয়ে ভয়াবহ এ সংকটে চিকিৎসক, রোগী এবং তার পরিবারের সদস্যদের এখন এ ধরনের বাছাইয়ে বাধ্য হতে হচ্ছে বলেও জানান সামরিক বাহিনীর সাবেক এ চিকিৎসক।

উত্তর ইতালির ইউনিভার্সাল হেলথকেয়ার সিস্টেম বিশ্বের অন্যতম প্রসিদ্ধ; সেখানকার পরিস্থিতিই এখন এরকম। ইতালির মধ্যে লম্বার্দির উত্তরাঞ্চল ও ভেনেতোতে প্রথম প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়া ভাইরাসটি এরই মধ্যে স্থানীয় হাসপাতালগুলোর নেটওয়ার্ককে পঙ্গু করে দিয়েছে; নিবিড় পর্যবেক্ষণ ইউনিটগুলোর ওপর সৃষ্টি করেছে ভয়াবহ চাপ।

তিন সপ্তাহের মধ্যে লম্বার্দিতে নিবিড় পর্যবেক্ষণ দরকার এমন এক হাজার ১৩৫ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে, অথচ ওই অঞ্চলে এরকম বেড বা আসনের সংখ্যা মাত্র ৮০০ বলে জানিয়েছেন মিলানের পলিক্লিনিকো হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের প্রধান গাইয়াকোমো গ্রাসেলি।

রয়টার্স বলছে, শ্বাসকষ্টের রোগীকে টিউব দেয়ার আগে চিকিৎসকরা সাধারণত তার সেরে ওঠার কতটুকু সম্ভাবনা রয়েছে তা মূল্যায়ন করেই সিদ্ধান্ত নিতেন। কাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে নেওয়া যায়, কাকে যায় না, সে হিসাব করে তারা আগেও রোগী বাছাই করতেন। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি তাদেরকে বাছাইয়ের কাজ নিয়মিত করতে বাধ্য করছে।

“আমরা এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে অভ্যস্ত নই,” বলেছেন ৪৮ বছর বয়সী অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট গ্রাসেলি।

করোনাভাইরাসে ষাটোর্ধ্বদের মৃত্যুহার এর চেয়ে কমবয়সীদের তুলনায় অনেক বেশি বলে বিভিন্ন দেশের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে।

পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ইতালির জনগোষ্ঠীই ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক; দেশটির প্রতি চারজনের একজনের বয়স ৬৫ বা তার বেশি।

ইতালির চিকিৎসকরা বলছেন, কভিড-১৯ এ আক্রান্ত বয়স্কদের অধিকাংশই শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা নিয়ে হাসপাতালগুলোতে হাজির হলেও যাদের সেরে ওঠার সম্ভাবনা কম বলে মনে হচ্ছে তাদেরকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

ভেতরে যেমন, ইতালির হাসপাতালগুলোর বাইরেও করোনাভাইরাস ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা নিয়ে হাজির হয়েছে। রোগীর ভিড় আর হাসপাতাল কর্মীদের টানা ২১ দিন কাজের পর শুক্রবার অনেকটা বাধ্য হয়েই ফিদেনজা শজরের মেয়র স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে প্রবেশাধিকার ১৯ ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখেন।

হাসপাতালগুলোকে সচল রাখতে এমনটা করা হলেও, এর অর্থ দাঁড়ায়, কিছু মানুষকে ‘বাড়িতে মৃত্যুবরণ করতে বলা’, বলেছেন মেয়র আন্দ্রিয়া মাসারি।

করোনাভাইরাসের কারণে গত সপ্তাহ থেকেই সমগ্র ইতালি অবরুদ্ধ হয়ে আছে। সব স্কুল, অফিস ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ। অনুমোদিত কারণ ছাড়া ঘরের বাইরে বের হতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

ইতালির সরকার দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব নিয়ে বেশি চিন্তিত, সেখানকার চিকিৎসাব্যবস্থা উত্তরাঞ্চলের তুলনায় খুবই খারাপ। ভাইরাসটি সেখানে একই গতি নিয়ে হাজির হলে পরিস্থিতির আরও মারাত্মক অবনতি ঘটতে পারে বলেও আশঙ্কা কর্তৃপক্ষের।

দেশটিতে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসা দেয়ার নিয়ম থাকলেও সরকার সব বেসরকারি হাসপাতালে কভিড-১৯ এ আক্রান্তদের বিনামূল্যে সেবাদিতে নির্দেশ দিয়েছে।

সান দোনেতো হাসপাতাল অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ভাইরাস উপদ্রুত শহরগুলোতে বিশেষ দল গঠন করে পাঠিয়েছে।

চিকিৎসক ও নার্সদের সহযোগিতায় মেডিকেল কলেজগুলোর চতুর্থ ও পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থীদের হাসপাতালগুলোতে নিয়ে আসা হয়েছে। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদেরও হাসপাতালের জরুরি কক্ষ ও কভিড-১৯ ওয়ার্ডগুলোতে রাখা হয়েছে।

লম্বার্দির প্রায় সব হাসপাতালের অপারেশন কক্ষগুলো এখন করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ইউনিটে পরিণত হয়েছে বলে পলিক্লিনিকো হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের প্রধান গ্রাসেলি।

এই অঞ্চলের সব নিবিড় পর্যবেক্ষণ ইউনিটের সমন্বয় সাধনের দায়িত্বও তার কাঁধে।

গ্রাসেলি জানান, হাসপাতালের কর্মীরা ওভারটাইম করছেন। কেউ কেউ তার আক্রান্ত সহকর্মীদের বদলে কাজ করছেন।

স্বাভাবিক সময়ে হাসপাতালগুলোতে প্রতি দুইজন রোগীর জন্য একজন নার্স থাকলেও; এখন একজন নার্সকেই গড়পড়তা চার থেকে পাঁচ রোগীর সেবাশুশ্রুষা করা লাগছে।

“আমাদের হাসপাতালে পুরো ব্যবস্থাপনাকেই ঢেলে সাজাতে হচ্ছে,” বলেছেন এ অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট।


-->


সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক: আবু সুফিয়ান
চেয়ারম্যান: মুসলিমা সুফিয়ান

কল: 01723-980255,01919-972103
নিউজ রুম :01710-972103
ইমেল: Photonews24@yahoo.com

১২মধ্য বেগুনবাড়ি,তেজগাঁও শিল্প এলাকা,ঢাকা -১২০৮
ইমেল: shufian707@gmail.com