মঙ্গলবার , ২৩ এপ্রিল ২০১৯


গার্মেন্ট ব্যবসার আড়ালে মাদকের চক্র




ফটো নিউজ ২৪ : 29/01/2019


-->

শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মাদকের চালান উদ্ধারের ঘটনায় কলম্বো ও ঢাকায় আট বাংলাদেশি গ্রেপ্তার হওয়ার পর এখন আন্তর্জাতিক এ মাদক চক্রের হোতাকে খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

র‌্যাব বলছে, আরিফ উদ্দিন নামের ওই ব্যক্তি ‘আল আমিন ফ্যাশন’ নামে একটি বায়িং হাউসের মালিক।

গার্মেন্ট ব্যবসার আড়ালে তিনি ওই চক্র গড়ে তুলেছেন, যার কর্মকাণ্ড মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, এমনকি চীন পর্যন্ত বিস্তৃত।

আরিফের চক্রের সদস্যদের অধিকাংশই বয়সে তরুণ, তাদের একটি অংশ নারী। দেশে-বিদেশে মাদক পাচার ও সংরক্ষণের কাজ করে আসছিলেন তারা।

 

গতবছর ৩১ ডিসেম্বর কলম্বোর কাছে দেহিওয়ালা এলাকার এক বাসায় অভিযান চালিয়ে ২৭২ কেজি হেরোইন ও ৫ কেজি কোকেন উদ্ধার করে শ্রীলঙ্কার পুলিশ নারকোটিক ব্যুরো ও স্পেশাল টাস্ক ফোর্স।

ওই বাড়ি থেকে মোহাম্মদ জামালউদ্দিন ও দেওয়ান রফিউল ইসলাম নামের দুই বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তার দুই সপ্তাহ আগে একই এলাকা থেকে ৩২ কেজি হেরোইনসহ সূর্যমণি নামে আরেক বাংলাদেশি নারীকে গ্রেপ্তার করে শ্রীলঙ্কার পুলিশ।

১৫ দিনের মধ্যে এই বিপুল পরিমাণ মাদকসহ তিন বাংলাদেশির ধরা পড়ার ঘটনা আলোড়ন সৃষ্টি করে, তদন্তের কাজে শ্রীলঙ্কার তরফ থেকে বাংলাদেশ সরকারের সহায়তা চাওয়া হয়।

এরপর তদন্তে নেমে ৫ জানুয়ারি উত্তরার এক বাড়ি থেকে চয়েজ রহমান নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর। তখনই তদন্তকারীদের সামনে আসে আরিফের নাম।

তবে শ্রীলঙ্কায় এ চক্রের দুজন ধরা পড়ার পরপরই গা ঢাকা দেন আরিফ। র‌্যাবের ধারণা, এরই মধ্যে তিনি দেশের বাইরে চলে গেছেন।

সোমবার রাতে ঢাকার কাউলা এলাকায় অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তাদের কাছ থেকে ১৯৭০টি ইয়াবা, বেশ কিছু বিদেশি মুদ্রা ও পাসপোর্ট জব্দ করা হয়।

এই পাঁচজন হলেন- ফাতেমা ইমাম তানিয়া (২৬), আফসানা মিমি (২৩), সালমা সুলতানা (২৬), শেখ মোহাম্মদ বাঁধন ওরফে পারভেজে (২৮) এবং রুহুল আমিন ওরফে সায়মন (২৯)।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ওই আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান চক্রের যেসব তথ্য র‌্যাব জানতে পেরেছে, তা মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন এ বাহিনীর আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান।

তিনি বলেন, ১৫ থেকে ২০ জন বাংলাদেশিকে মাদকের এই চক্রে যুক্ত করেছেন আরিফ। এই চক্র বিদেশের পাশাপাশি দেশের ভেতরেও ইয়াবার কারবারে যুক্ত।

“গ্রেপ্তাররা বলেছে, আরিফ নিজে সিন্ডিকেটে লোক রিক্রুট করত। মূলত স্বল্প শিক্ষিত, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত স্মার্ট মেয়েদেরকে প্রাধান্য দিত সে।

পরীক্ষামূলকভাবে প্রথমে তাদের ব্যবসায়িক কাজে নিয়োজিত করা হত। বিশ্বস্ততা অর্জন করলে দেশের ভেতরে মাদক সংগ্রহ, সরবরাহ ও বিতরণের কাজে তাদের লাগানো হত।

“এসব কাজে পারদর্শী হয়ে উঠলে তাদের বিদেশে পাঠিয়ে বিদেশি কালচারের সঙ্গে অভ্যস্ত করে তোলা হত। বার বার বিদেশ ঘুরিয়ে পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করা হত। তারপর তাদের বিদেশে মাদক সরবরাহ ও বিতরণের কাজে লাগানো হত।”

বর্ণিত মাদক সিন্ডিকেটের আফগানিস্থান, পাকিস্তান, চীন, মালয়েশিয়া ও শ্রীলংকায় নেটওয়ার্ক রয়েছে। মাদক পরিবহনে বিভিন্ন পথ ব্যবহার করা হয়।

এই র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, এই চক্রের কোন সদস্য কোন দেশে মাদকের কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে- সে তথ্য এখনও তারা উদঘাটন করতে পারেননি।

“তারা মূলত কলম্বোকে নিরাপদ স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছিল। সেখান থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া বা চীনে চালান পাঠানো হত।”

এই চক্রের অন্যতম সদস্য রেহানা বেগম মাদকসহ গ্রেপ্তার হয়ে এখন চীনের কারাগারে বন্দি বলেও র‌্যাবের সংবাদ সম্মেলনে তথ্য দেওয়া হয়।

মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ঢাকায় গ্রেপ্তার তিন নারীর মধ্যে আফসানা মিমি নাচ, গান ও অভিনয়ে পারদর্শী। বিভিন্ন ড্যান্স ক্লাবে তিনি পারফর্ম করতেন।

সেই সূত্রে রুহুল আমীন সায়মনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। রুহুল আমি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের কর্মী হিসেবে তার কাছে পরিচয় দেন। পরে তার মাধ্যমেই প্রায় দেড় বছর আগে প্রথমে রেহানা ও পরে বায়িং হাউজ ব্যবসায়ী আরিফের সঙ্গে মিমির পরিচয় হয়।

ওই পাঁজজনকে আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে র‌্যাব জানতে পেরেছে, মিমিকে নিয়ে ২০১৭ সালে মালয়েশিয়ায় যান আরিফ। সেখানে একটি মাদকের চালান সংগ্রহ করে মিমি আর রেহানা যান শ্রীলঙ্কায়।

২০১৮ সালে দ্বিতীয়বারের মত শ্রীলঙ্কায় নিয়ে গিয়ে মিমিকে সূর্যমণির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন আরিফ। সেবার প্রায় ২৫ দিন শ্রীলঙ্কায় ছিলেন মিমি।

ওই সময় সূর্যমণির সঙ্গে মিলে বিভিন্ন এলাকায় মাদক সরবারহ করেন তিনি।

গতবছর শেষ দিকে মিমি আবার শ্রীলঙ্কায় যান। এবা তিাকে রাখা হয় অন্য একটি বাসায়। বিভিন্নভাবে শ্রীলঙ্কায় পৌঁছানো মাদকের চালান সংগ্রহ ও মজুদ রাখা ছিল তার কাজ। কিছুদিন পর দেশে ফিরে আসেন মিমি। আর ৩১ ডিসেম্বর কলম্বো পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন সূর্যমণি।

র‌্যাবের সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, শরিয়তপুরের মেয়ে ফাতেমা ইমাম তানিয়া ২০১৬ সালে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে কোচিং করার সময় ফারহানা নামে এক সহপাঠীর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়। এই ফারহানা গ্রেপ্তার হওয়া রুহুল আমীন সায়মনের স্ত্রী।

পরে সায়মনের মাধ্যমে রেহানার সঙ্গে তার পরিচয় হয় তানিয়ার। ২০১৬ সালে তাকে মাদক সিন্ডিকেটে যুক্ত করেন রেহানা।

২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ বার মালয়েশিয়া এবং শ্রীলংকা গেছেন তানিয়া। এছাড়া দুইবার ভারতে এবং তিনবার চীনে যাওয়ার তথ্যও পেয়েছে র‌্যাব। মালয়েশিয়া থেকে শ্রীলঙ্কা যাওয়ার সময় লাগেজে মাদক বহনের কথা তিনি জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন বলেও র‌্যাবের সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

মুফতি মাহমুদ খান বলেন, “মাদকের কারবারের জন্য শ্রীলঙ্কায় অন্তত চারটি বাসা ভাড়া করা হয়েছিল বলে তানিয়া আমাদের জানিয়েছেন।

বাসাগুলো ভাড়া করতে মিমি ও আরও কয়েকজনের ডকুমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে।”

ওই বাসাগুলোতে মাদকের চালান রাখা হত এবং সেখান থেকে শ্রীলঙ্কার ভেতরে এবং প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশে সরবরাহ করা হত বলে তথ্য পেয়েছে র‌্যাব। এই চক্রের আরেক সদস্য সালমা সুলতানাও সেখানে কাজ করেছেন। গত এক বছরে বেশ কয়েকবার শ্রীলঙ্কা, চীন ও ভারতে যাতায়াত করেছেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০১০ সালে এইচএসসি পাস করার পর ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ শুরু করেন সালমা। তখনই তানিয়ার মাধ্যমে রেহানার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। মাদকের চক্রে তিনি যুক্ত হন ২০১৭ সালে।

গ্রেপ্তার পাঁচজনের মধ্যে বাঁধন ওরফে পারভেজ ‘মাদক চক্রের হোতা’ আরিফের বায়িং হাউজের কর্মী। ২০১৭ সালে তিনি এক্সিকিউটিভ হিসেবে ওই বায়িং হাউজে যোগ দেন। এক পর্যায়ে তাকে সিন্ডিকেটে যুক্ত করে নেওয়া হয়।

র‌্যাব বলছে, গতবছর দুইবার শ্রীলঙ্কায় গিয়ে এক মাসের মত থাকেন পারভেজ। আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকে যাওয়া মাদকের চালানগুলো শ্রীলঙ্কায় ছড়িয়ে দেওয়া ছিল তার কাজ।

আর রুহুল আমীন সায়মন আত্মীয়তার সূত্রে রেহানার মাধ্যমে এই চক্রে যুক্ত হন। সিন্ডিকেটের সদস্যদের জন্য পাসপোর্ট, ভিসা ও টিকেটের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি দলের জন্য নতুন লোক খোঁজার কাজেও তিনি যুক্ত ছিলেন বলে র‌্যাবের ভাষ্য।

র‌্যাব এখন আরিফের সন্ধানে কাজ করছে জানিয়ে মুফতি মাহমুদ খান বলেন, “প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে সে দেশের বাইরে অবস্থান করছে। তাছাড়া চীনের কারাগারে থাকা রেহেনা বেগমকে কীভাবে দেশে ফিরিয়ে আনা যায়, তাও দেখা হচ্ছে।

 

-এ


-->


সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক: আবু সুফিয়ান
চেয়ারম্যান: মুসলিমা সুফিয়ান

কল: 01723-980255,01919-972103
নিউজ রুম :01710-972103
ইমেল: [email protected]

১২মধ্য বেগুনবাড়ি,তেজগাঁও শিল্প এলাকা,ঢাকা -১২০৮
ইমেল: [email protected]