বৃহস্পতিবার , ১৫ নভেম্বর ২০১৮


চীন উইঘুরদের দমন, মুসলিম বিশ্ব কেন চুপ?




ফটো নিউজ ২৪ : 01/09/2018


-->

   ডেস্ক রিপোর্ট : চীনে সংখ্যালঘু মুসলিমদের নির্যাতন বন্ধ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে থেকে চাপ আসলেও, কোনো মুসলিম দেশের সরকারই এখনও বেইজিংয়ের গুরুতর সমালোচনা করেনি।
প্রায় তিন সপ্তাহ আগে জাতিসংঘ জানায়, তারা ‘বিশ্বস্ত খবরে’ জানতে পেরেছেন চীনে ১০ লাখ উইঘুর মুসলিমকে ‘পুনরায় শিক্ষিত করার শিবির (রি-এডুকেশন ক্যাম্প)’ বা বন্দীশিবিরে আটকে রাখা হয়েছে। এরপর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো এই বিষয়ে এখনও কোনো লক্ষণীয় বিবৃতি দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের সাংসদরা এই সপ্তাহে চীনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আবেদন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার আহ্বান জানানোর পর, মুসলিম বিশ্বের নেতাদের এই নিরবতা আরও দৃষ্টিকটু হয়ে উঠেছে।

সিনেটর মার্কো রুবিও এবং ক্রিস স্মিথ বুধবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওকে পাঠানো এক চিঠিতে বলেন, তারা আশা করছেন মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই ঘটনায় স্টেট ডিপার্টমেন্ট অন্যান্য দেশের সঙ্গে মিলিতভাবে কঠোর কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিবে এবং আন্তর্জাতিক ফোরাম বিভিন্ন সংস্থায় বিষয়টি উত্থাপন করবে।
কিন্তু এর বিপরীতে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ও পাকিস্তান কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। সৌদি আরবও দেয়নি। এমনকি তুরস্কও, যারা কিনা আগে তুর্কি ভাষাভাষী উইঘুরদের অনুকূল নীতিমালার প্রস্তাব দিয়েছিল এবং সেখানে অল্প সংখ্যক উইঘুর সম্প্রদায়ের লোক থাকলেও, রজব তৈয়ব এরদোয়ান এবিষয়ে নীরব রয়েছেন।
বহু মুসলিম দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যের অংশীদার এবং সহায়তা প্রদানকারী দেশ হিসেবে চীন কিভাবে লাভবান হচ্ছে তা এই বিভাজনে ফুটে উঠেছে। একই সঙ্গে অন্যদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য প্রদান না করার যে কৌশল চীন গ্রহণ করেছে সেটিও এখন তাদের কাজে লাগছে।
উইঘুরদের নির্যাতনের ঘটনাটি ঘটছেও চীনের প্রত্যন্ত এলাকা জিনজিয়াংয়ে, যেটা ব্যাপকভাবে পুলিশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। একারণে সেখান থেকে এমন কোনও ছবি বা ভিডিও জোগাড় করা যাচ্ছে না যা দিয়ে মুসলিম বিশ্বের মতামতকে প্রভাবিত করা যায়।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাহরির ইন্সিটিউটের সিনিওর ফেলো হাসান হাসান বলেন, ‘সাধারণভাবে চীনের সঙ্গে বেশিরভাগ মুসলিম দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। জিনজিয়াংয়ে কী ঘটছে তা মুসলিম বিশ্বের লোকেরা প্রায় জানেই না। আরবীয় গনমাধ্যমগুলোতে এটা নিয়ে সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে না। এমনকি জিহাদিরাও অন্যান্য সংঘাতের বিষয়ে সচেতন থাকলেও এটা নিয়ে তারা তেমন কথা বলেন না।’
চীন জিনজিয়াংয় প্রদেশে সমস্যার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করে আসছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্তে অবস্থিত প্রদেশটিতে প্রায় এক কোটি উইঘুর বসবাস করেন। বৃহস্পতিবার বেইজিং মার্কিন আইন প্রণেতাদের চীনের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করতে সতর্ক করে দিয়েছেন।
বর্ণবৈষম্য নির্মূলে কাজ করে যাওয়া জাতিসংঘের একটি কমিটি বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে জানায়, জিনজয়াংয়ে বন্দীশিবিরে আটকদের সংখ্যা কয়েক হাজার থেকে দশ লক্ষ পর্যন্ত হতে পারে। যাদের আটকে রাখা হয়েছে, তাদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে বেইজিংয়ের প্রতি আহ্বান জানায় ওই কমিটি । একইসঙ্গে তারা বন্দীদের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ এবং ধর্ম-বর্ণ ও জাতির ভিত্তিতে বৈষম্যের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তেরও দাবি জানায়।
ওই অঞ্চলে উইঘুরদের সম্পৃক্ততায় মারাত্মক কয়েকটি হামলার পর প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মুসলিম চরমপন্থিদের বিরুদ্ধে ‘প্রথমে আক্রমণ (স্ট্রাইক ফার্স্ট)’ করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয় মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়টির কিছু সদস্য সিরিয়ায় সন্ত্রাসী দলের হয়ে লড়াই করছে।
কমিউনিস্ট পার্টির একটি পত্রিকায় উইঘুরদের বিরুদ্ধে ওই অভিযানের সমালোচনার জবাবে বলা হয়, এর ফলে জিনজিয়াং আরেকটি সিরিয়া হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে।
উইঘুরদের বিষয়ে নীরবতার চিত্রটি মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের দমন অভিযানের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের চিত্রের ঠিক বিপরীত। গত বছর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দমন অভিযান শুরু করলে রাখাইন রাজ্য থেকে সাত লক্ষ রোহিঙ্গা প্রাণ পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। জাতিসংঘ এই দমন অভিযানকে ‘গণহত্যার’ সামিল বলে মন্তব্য করেছে। এই দুই দেশের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, মিয়ানমারের অর্থনীতি চীনের অর্থনীতির ১৮০ ভাগের এক ভাগ মাত্র। অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কোঅপারেশনের (ওআইসি) ৫৭ সদস্য দেশের মধ্যে ২০ টির সঙ্গেই চীনের বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে।
সৌদি আরবের থেকে রপ্তানিকৃত তেলের দশ ভাগের এক ভাগ এবং ইরানের তেলের তিন ভাগের একভাগ চীনে যায় বলে জানিয়েছে মার্কিন পত্রিকা ব্লুমবার্গ। মালয়েশিয়ায় বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রধান উৎস চীন। একই সঙ্গে দেশটি চীনা-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর প্রজেক্ট অর্থায়ন নিশ্চিত করতে ছয় হাজার কোটি ডলারেরও বেশি ঋণ দিয়েছে।
ওয়ার্ল্ড উইঘুর কংগ্রেসের এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান ওমার কানাত বলেন, মুসলিম দেশগুলো চীনকে পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য মিত্র হিসেবে বিবেচনা করে এবং তারা চীনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খারাপ করতে চায় না, একারণে নীরব আছে।’
বছরের পর বছর ধরে এসব দেশের সরকার মুসলিমদের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সমালোচনা করে আসছে। ২০১৭ সালে সাতটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করারও সমালোচনা করে তারা। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ এটাকে ‘সন্ত্রাসবাদীদের জন্য বিশাল উপহার। বলে অভিহিত করেছিলেন।
আগস্ট ১০ তারিখে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক একটি প্যানেলকে বিভিন্ন প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে জানায় বেইজিং বন্দীশিবিরে প্রায় এক কোটি উইঘুরকে আটকে রেখেছে। ব্লুমবার্গ পত্রিকা জানুয়ারি মাসে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, সরকার ওই রাজ্যে চেহারা সনাক্ত করার প্রযুক্তি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে।
তুরস্ক, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, কাজাখস্তান, সৌদি আরব, ও মিশর এসব খবরের বিষয়ে মন্তব্য দিতে অস্বীকার করে। ওআইসিতে একাধিকবার ফোন করা হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে জানায় ব্লুমবার্গ।
শুধু বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রাখাটাই এখানে একমাত্র প্রভাবক নয়, তা নিশ্চিত। কয়েকটি দেশের সরকার তাদের নিজের দেশের মানবাধিকারের জীর্ণ অবস্থার বিষয়ে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায় না। অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বের সংঘাত নিজেকে দূরে রেখেছে বেইজিং।
এই দেশগুলো নিজেরাই মানবাধিকারের বিষয়টি তেমন শ্রদ্ধা করে না, একারণে তারা চীনের সমালোচনা করার একটা সুযোগ পেয়েও এগিয়ে আসছে না, বলে মন্তব্য করেন ইউনিভার্সিটি অফ সিডনির চাইনিজ হিস্টরি অধ্যাপক ডেভিড ব্রফি।
তা সত্ত্বেও এসব দেশের চুপ করে থাকাটা কঠিন হয়ে উঠবে কারণ, জিনজিয়াংয়ে চীনের পলিসি তার দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বাইরেও প্রভাব ফেলছে।
কাজাখ বংশোদ্ভূত এক চীনা নাগরিক সম্প্রতি জানান, সে চীনের সীমান্তবর্তী দেশ কাজাখস্তানে পালিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত একটি চীনের একটি বন্দীশিবিরে তাকে শিক্ষকতা করতে বাধ্য করা হয়েছে। কাজাখস্তানের সরকার চীনের ক্রোধ পড়ার ঝুঁকি নিয়েও ওই ব্যক্তিকে আশ্রয় দিয়েছে।
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেমস মিলওয়ার্ড বলেন, ‘এই ঘটনা থেকে বুঝা যাচ্ছে উইঘুরদের বিরুদ্ধে অভিযান চীনের বৈদেশিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করা শুরু করেছে। চীনের বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মানুষের বৈচিত্র্যের ব্যাপারে মনোভাব পরিবর্তনের ফলে নেয়া পলিসির প্রভাবটাই আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি।’

—- আর


-->


সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক: আবু সুফিয়ান
চেয়ারম্যান: মুসলিমা সুফিয়ান

কল: 01723-980255,01919-972103
নিউজ রুম :01710-972103
ইমেল: [email protected]

১২মধ্য বেগুনবাড়ি,তেজগাঁও শিল্প এলাকা,ঢাকা -১২০৮
ইমেল: [email protected]