রবিবার, ২০ অগাস্ট ২০১৭
  • প্রচ্ছদ » জাতীয় » দেশ জাজেস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে : বিচারপতি খায়রুল হক


দেশ জাজেস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে : বিচারপতি খায়রুল হক




ফটো নিউজ ২৪ : 09/08/2017


ABM+Khairul+Haqueনিজস্ব প্রতিবেদক : সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার রায়ের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক; ওই রায়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার কিছু পর্যবেক্ষণ নিয়ে করেছেন কঠোর সমালোচনা।

সর্বোচ্চ আদালতের ওই রায়কে তিনি বলেছেন ‘পূর্ব ধারণা প্রসূত’, সংসদ সদস্যদের নিয়ে প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণকে তার ‘অপ্রাসঙ্গিক’ মনে হয়েছে, শব্দ চয়নে তিনি ‘অপরিপক্কতা’ দেখতে পাচ্ছেন।

বিচারপতি খায়রুল হক বলেছেন, “সংবিধানের ১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ। কিন্তু এই রায়ের পর মনে হচ্ছে দেশ জাজেস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে।”

সর্বোচ্চ আদালতের ওই রায়ের প্রতিক্রিয়া জানাতে এসে বুধবার আইন কমিশনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেন ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১১ সালের মে পর্যন্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করা খায়রুল হক।

তিনি বলেন, “এই প্রথম কোনো রায়ে দেখলাম, সংবিধানের ‘অরিজিনাল’ বাদ দিয়ে মার্শল লয়ের প্রভিশন ফিরিয়ে আনা হয়েছে।”

‘মূল বিচার্য বিষয়কে পাশ কাটিয়ে’ ওই রায়ের পর্যবেক্ষণে সংসদ, নির্বাচন কমিশন ও দেশের সামাজিক অবস্থা নিয়ে যেসব প্রসঙ্গ এসেছে, তা বাঞ্ছনীয় ছিল না বলেও মন্তব্য করেন বিচারপতি খায়রুল হক।

“অনারেবল চিফ জাস্টিস যদি বলেন, পার্লামেন্ট ইজ ইমম্যাচিউরড বা সংসদ সদস্যরা অপরিপক্ক, তাহলে তো আমাকে বলতে হয়, অভিয়াসলি লজিক্যালি চলে আসে, সুপ্রিম কোর্টের জজ সাহেবরাও তাহলে ইমম্যাচিউরড। কারণ তারাও তাদের রায়ের মধ্যে সংসদ সদস্যদের বিষয়ে বলেছেন, যা তাদের বলার দরকারই ছিল না।

“হাই কোর্টের রায়ে বলার কারণে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগকে এক্সপাঞ্জ পর্যন্ত করতে হয়েছে। তার মানে, সুপ্রিম কোর্টকে যদি হাই কোর্ট বিভাগের রায়ের অংশ বিশেষ এক্সপাঞ্জ করতে হয়, তাহলে তো এটা দৃশ্যমান যে এটি হাই কোর্ট বিভাগের বিচরপতিদের অপরিপক্কতা। না হলে এক্সপাঞ্জ করার প্রয়োজনীয়তা কেন থাকবে?”

পরস্পরের প্রতি সম্মান না রেখে একে অপরের প্রতি অসংসদীয় ভাষা ব্যবহার করলে তা দুই পক্ষেরই অপরিপক্কতার প্রমাণ দেয় বলে মন্তব্য করেন আইন কমিশনের চেয়ারম্যান।

সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়ের ধারাবাহিকতায় আইন না করেই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, “যখন সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ছিল না, তখনও ইনডিপেনডেন্ট জুডিশিয়ারি ছিল। এই কাউন্সিল একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”

উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব সংসদে পাস হয়, যা ষোড়শ সংশোধনী হিসেবে পরিচিত।

এক রিট মামলার রায়ে হাই কোর্ট গতবছর ওই সংশোধনী ‘অবৈধ’ ঘোষণা করলে গত ৩ জুলাই আপিলের রায়েও তা বহাল থাকে। ১ অগাস্ট আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে জানা যায়, ৯৬ অনুচ্ছেদের ছয়টি ধারা পুনর্বহাল করার মধ্যে দিয়ে সামরিক সরকারের করা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান ফিরিয়ে এনেছে সর্বোচ্চ আদালত।

মোট ৭৯৯ পৃষ্ঠার এই রায়ের পর্যবেক্ষণে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা রাজনীতি, সামরিক শাসন, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি, সুশাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমালোচনা করেন।

ওই রায়ের পর গত এক সপ্তাহে সরকারের আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া এখনও আসেনি। আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বৃহস্পতিবার এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসার কথা রয়েছে। তার আগেই বুধবার বিকালে আইন কমিশনের সংবাদ সম্মেলনে বিচারপতি খায়রুল হকের প্রতিক্রিয়া এল।

তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। কোনো রায় প্রকাশ হওয়ার পর যে কেউ তা নিয়ে আলোচনা করতে পারে।

“রায়ের ২২৩, ২২৪ এবং আরও অনেক জায়গায় ডেরোগোটরি রিমার্ক করা হয়েছে। বিচারক এমন কথাও বলেছেন, এমপি হওয়ার আগে তাদের কনসিডার করা উচিৎ যে তারা এমপি হওয়ার যোগ্য কি না। তিনি এমপি হওয়ার যোগ্য কি না সেটা তো যারা ভোটার তারা বুঝবে। সর্বোচ্চ আদালত থেকে এ ধরনের মন্তব্য মেনে নেওয়া যায় না।

“এমপি সাহেবরা এখন যদি উল্টো করে বলেন, হাই কোর্টের জাজরা বিচারপতি হওয়ার উপযুক্ত কিনা, সেটা তারা বিবেচনা করে দেখেছেন কিনা- কেমন শোনাবে? কথায় তো কথা বাড়ে। এ ধরনের অপ্রাসঙ্গিক কথা কেন অ্যাপেক্স কোর্টের রায়ে আসবে? আসাটা বাঞ্ছনীয় নয় বলে আমি এবং আমরা মনে করি।”

ষোড়শ সংশোধনীকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করে ওই রায়ে বলা হয়েছে, ওই সংশোধনীর আগে যে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ব্যবস্থা ছিল, তা পুনঃস্থাপিত হল।

কোনো বিচারক শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণে দায়িত্ব পালনের অযোগ্য হয়ে পড়লে বা তার বিরুদ্ধে গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন এই কাউন্সিল তদন্ত করে সুপারিশ দেবে এবং তার ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি ওই বিচারককে অপসারণের ব্যবস্থা নেবেন।

বিচারকদের জন্য ৩৯ দফার নতুন আচরণবিধি ঠিক করে দিয়ে আপিল বিভাগ রায়ে বলেছে, এই আচরণবিধি মেনে না চললে তা বিচারকের অসদাচরণ বলে গণ্য হবে।

ওই রায় প্রকাশের পর গত রোববার প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার কার্যালয়ে কাউন্সিলের প্রথম সভা হয় বলেও সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে।

তবে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বলছেন, এই রায়ের বিষয়টি শুনানির আগেই প্রধান বিচারপতির মনে একটি ধারণা হিসেবে ছিল বলে তার মনে হয়েছে।

“এই রায় হওয়ার আগে থেকেই কি এটা প্রিকনসিভড নোশন ছিল, যে পার্লামেন্ট ডিসফাংশনাল, পার্লামেন্টের সদস্যরা ইমম্যাচিউরড, অশিক্ষিত, অজ্ঞ… এই কথাগুলো যদি রায়ের আগে থেকেই বলে থাকেন তাহলে তো বলা হবে, এই রায় এবং এর শুনানি আগে থেকেই প্রিকনসিভড।… শুনানি করার সময় উনার মনের মধ্যেই ছিল…।”

এটা ‘ভালো বিচারকের আচরণ’ নয় বলেও মন্তব্য করেন সাবেক এই প্রধান বিচারপতি।

সংবিধানের ‘মূল অংশ বাদ দিয়ে’ সামরিক ফরমানের বিধান ফিরিয়ে আনা প্রসঙ্গে বিচারপতি খায়রুল হকের বক্তব্যের সূত্র ধরে একজন সাংবাদিক সংবাদ সম্মেলনে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

বিচারপতি খায়রুল হকের দেওয়া ওই রায়ে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যায়। ওই রায়ের পরও সংবিধানে সামরিক আমলের ‘অনেক কিছু’ থেকে গেছে মন্তব্য করে আইন কমিশনের চেয়ারম্যানের বক্তব্য জানতে চান ওই সাংবাদিক।

জবাবে বিচারপতি খায়রুল হক কেবল বলেন, “নিজের রায় নিয়ে কিছু বলা উচিৎ না।”

উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে সংসদের হাতেই ছিল। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর সময়ে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারক অপসারণের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা হয়।

পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় গিয়ে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী এনে বিচারক অপসারণের বিষয় নিষ্পত্তির ভার দিতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করেন। ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে সেই ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরে গেলেও আপিল বিভাগের রায়ে তা বাতিল হয়ে যায়।

বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ছাড়াও আইন কমিশনের সদস্য বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবির ও মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা ফউজুল আজিম সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

এমডি/মানিক




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক: আবু সুফিয়ান
চেয়ারম্যান: মুসলিমা সুফিয়ান

কল: 01723-980255,01919-972103
নিউজ রুম :01710-972103
ইমেল: [email protected]

১২মধ্য বেগুনবাড়ি,তেজগাঁও শিল্প এলাকা,ঢাকা -১২০৮
ইমেল: [email protected]